ধর্মের প্রতি আগে থেকেই অনুরাগ ছিল। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজ তাগিদে চালান গবেষণা। সেখান থেকেই মনে ভালো লাগাটা কাজ করে। ইসলামের সুমহান আদর্শ, সরলতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ কাছে টানে ওয়েন ডিলন পার্নেলকে। সে আর্কষণেই শান্তির ধর্ম গ্রহণ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই বাঁ-হাতি পেসার। ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে পার্নেল হয়ে যান মুসলিম। তবে সত্যটি সবার সামনে নিয়ে আসেন ওই বছরের ১০ জুন। ধর্ম সর্বজনীন আবার একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ও। তবে পার্নেল ইসলামকে যেভাবে ধারণ করেন, যা যেকোনো মুসলিমের জন্য হতে পারে আদর্শ। এ নিয়ে তার নেই কোনো রাখঢাক।
পোর্ট এলিজাবেথে জন্ম নেওয়া এই ফাস্ট বোলার দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সি গায়ে জড়ানোর মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ধর্ম বদলে ফেলেন। কিন্তু কেন এমনটা করলেন- এমন প্রশ্ন অনেকেরই মনে ঘুরপাক খেয়েছে। ভক্ত-সমর্থকদের মনের সেই কৌতূহল মেটাতে পার্নেল দিয়েছেন জুতসই ব্যাখ্যা- ‘আমার কাছে মনে হয়েছে ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে সরলতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ, যা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। আমি ভাগ্যবান যে, এ ধর্ম গ্রহণ করতে পেরেছি। বিশ্বের যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই বহু মানুষের সম্মান পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, সবাই আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন।’
ধর্মান্তরিত হয়েছেন পার্নেল। বেছে নিয়েছেন ইসলামিক নাম- ওয়ালিদ, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘সদ্য ভূমিষ্ঠ পুত্রসন্তান’। তবে পুরোনো নাম মুছে ফেলেননি। তিনি চান ক্রিকেটপ্রেমীরা তাকে আগের নামেই ডাকুক, “যদিও আমি আমার নাম ‘ওয়ালিদ’ ঠিক করেছি, তবে আমি চাই সবাই আমাকে আমার আগের নামেই ডাকুক। কিন্তু এখনো আমার নাম ওয়েন ডিলন পার্নেল। আমি আমার দলের সবকিছুতে সব সময় এগিয়ে থাকব। আমার মূল লক্ষ্য থাকবে দলের জন্য সেরাটা দিয়ে খেলা। যেহেতু রোজার সময় চলে আসছে, আমি চাই সবাই আমার সিদ্ধান্তটিকে ইতিবাচকভাবে নেবে।”
পার্নেলের আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটকে আলোকিত করেন দুই মুসলিম ক্রিকেটার হাশিম আমলা এবং ইমরান তাহির। এজন্য অনেকে মনে করেন, এই দুই সতীর্থের প্রভাবে পার্নেল ধর্ম পরিবর্তন করেছেন । আসলেই কি ব্যাপারটা তেমন কিছু? পার্নেল এমন দাবি অস্বীকার করে জানান, গভীরভাবে ভেবেছিলেন বলেই ইসলাম ধর্মের শান্তিপূর্ণ বিষয়গুলো সব দিক থেকে আকৃষ্ট করেছে তাকে, ‘আমি যখন জাতীয় দলে সুযোগ পাই, তখন হাশিম ভাই প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটার। ইমরান ভাইও ছিলেন। কিন্তু তারা কিছুই জানতেন না। ইসলাম গ্রহণ করার কিছুদিন পর তাদের জানিয়েছিলাম। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তাদের প্রায়ই এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আসলে ঘটনা অন্যরকম। আমি ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ব্যক্তিগত পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনার পর ইসলাম গ্রহণ করি এবং এটি এমন একটি বিশ্বাস, যার প্রতি আমি সবসময় আগ্রহী ছিলাম। আমি একজন পেশাদার ক্রিকেটার এবং জীবনের এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ক্ষমতা ও সৎসাহস আমার আছে। এই সিদ্ধান্তে দলের কোনো সদস্য কিংবা আমাকে কেউ উদ্বুদ্ধ করেননি। আমি নিজেই আমার জন্য ভালোটা বেছে নিয়েছি।’
পার্নেল ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেও কোনো কারণ স্পষ্ট করে জানাননি। তবে একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, তিনি নিয়মিত মুসলিম বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। আর সেই মেলামেশা থেকেই ইসলামের আলোর পথে ধাবিত হন। তার মধ্যে অনুরাগ জন্মে ইসলামি অনুশাসনের প্রতি।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ম্যানেজার মোহামেদ মোসাজিও একজন মুসলিম। পার্নেলের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার নেপথ্যে সতীর্থ হাশিম আমলা বা ইমরান তাহিরের কোনো হাত নেই। পার্নেলের মতো ব্যাপারটা বেশ জোর দিয়েই জানিয়েছেন মোসাজি। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আগেই ওয়েন ইসলাম অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটা তার সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমি নাম পরিবর্তনের ব্যাপারে কিছু জানি না।’
পাকিস্তানের ক্রিকেটার ইউসুফ ইউহানার (মোহাম্মদ ইউসুফ) পর পার্নেল দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে অন্য ধর্ম ছেড়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। শ্রদ্ধার সঙ্গে নতুন ধর্মের নিয়ম-কানুন পালন করেন পার্নেল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রোটিয়া ক্রিকেটার জানিয়েছিলেন, নতুন ধর্ম অনুসরণের ব্যাপারটি পার্নেল খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ অ্যালকোহল স্পর্শ করেননি পার্নেল। নিজের গায়ের জার্সিতে জায়গা দেননি দক্ষিণ আফ্রিকার বিয়ার কোম্পানি ক্যাস্টল ল্যাগারের লোগো।
নিয়মিত নামাজ পড়েন তিনি। সময় পেলেই তেলাওয়াত করেন পবিত্র কোরআন শরিফ। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে রেখেছেন দাড়ি। নিজে গায়ে জড়ান জুব্বা, মাথায় পরেন টুপি। আর তার স্ত্রী পর্দা মেনে পরেন বোরকা, রমজানে রাখেন রোজা। জীবনের প্রথম রমজানের আগে রোজা রাখা নিয়ে জানতে চাইলে পার্নেল সম্মানের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানান, ‘আমার ধর্ম বিশ্বাসের পছন্দ এমন একটি বিষয়, যা আমি গোপন রাখতে চাই।’
পার্নেল ২০১৬ সালের মে মাসে ইসলামি শরিয়াহ মেনে বিয়ে করেন আয়েশা বাকেরকে। ওয়ালিদ ওয়েন পার্নেল ও আয়েশা বাকের ২০১৮ সালের মে মাসে স্বাগত জানান পুত্রসন্তানকে। তার ইসলামিক নাম রাখেন খালিদ। ২০২১ সালের জুলাইয়ে এই তারকা দম্পতির ঘর আলো করে আসে দ্বিতীয় সন্তান। কন্যাসন্তানের নাম রাখেন সালমা। ২০২২ সালের ৩ মে পার্নেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন পারিবারিক ছবি। ওই ছবিতে পরিবারের ইসলামি বেশভূষা প্রমাণ করে পার্নেল এখন পুরোপুরি প্র্যাকটিসিং মুসলিম।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

