সিলেটে গত ১ সেপ্টেম্বর হওয়া বোর্ডসভার পর পরই আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কাউন্সিলর মনোনয়নের চিঠি পাঠায় বিসিবি। ঢাকার লিগে খেলা ৭৬ ক্লাব, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা এবং অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে নির্বাচনের জন্য কাউন্সিলর মনোনয়ন নিয়ে থাকে বিসিবি। ঢাকার লিগে খেলা চার ক্লাবের জন্য এখনও চিঠি ইস্যু করা হয়নি বিসিবি থেকে। ক্লাবগুলোর মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় চিঠি দেওয়া হয়নি। যেসব ক্লাবের নামে চিঠি ইস্যু করা হয়নি সেগুলো হলো- ঢাকা স্পার্টান্স, ব্লুজ ক্রিকেটার্স, ঢাকা রেঞ্জার্স ও গোল্ডেন ঈগলস।
গত ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এই চার ক্লাবের মালিকানা কিনে নেন তানভীর আহমেদ। তখন ক্লাবগুলোর নাম ছিল- মিরপুর বয়েজ ক্রিকেট ক্লাব (ঢাকা রেঞ্জার্স), ওরিয়েন্ট ক্রিকেট একাডেমি (গোল্ডেন ঈগল), আজিম ক্রিকেট ক্লাব (ঢাকা স্পার্টান্স) ও মাতুয়াইল ক্রিকেট একাডেমি (ব্লুজ ক্রিকেটার্স)। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বদল হয় ক্লাবগুলোর নাম। মালিকানা পাওয়ার পর থেকে তানভীর ক্লাবগুলো পরিচালনা করলেও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বদলে যায় দৃশ্যপট। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর বিসিবিতে দেওয়া চিঠিতে নিজেকে এই চার ক্লাবের প্যাট্রন দাবি করেন লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। ঢাকা রেঞ্জার্স ও গোল্ডেন ঈগল ক্লাবে তিনি এককভাবে প্যাট্রন থাকলেও ঢাকা স্পার্টান্স ও ব্লুজ ক্রিকেটার্স ক্লাবে তার সঙ্গে বর্তমান বিসিবি পরিচালক মাহবুব আনামের নাম আছে।
প্যাট্রন দাবির স্বপক্ষে বিসিবিতে জমা দেওয়া দলিলে আছে ক্লাবগুলোর কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর। ঝামেলার শুরু ওই স্বাক্ষর নিয়ে। তানভীরের দাবি স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে এবং ৫ আগস্টের আগে হওয়া কমিটি সম্পর্কে অবগত নন। ৫ আগস্টের আগে ক্লাবগুলোর কমিটিতে ছিল বেক্সিমকোর বিভিন্ন পর্যায়ে চাকুরিরতদের নাম। এমন কী ৫ আগস্টের আগে ক্লাবগুলোর করা কমিটি নিয়ে আছে প্রশ্ন। সাধারণত, সবশেষ মেয়াদে থাকা কমিটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নতুন কমিটি অনুমোদন করেন। এখানে সেই নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। বেশ কয়েকটি কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন কমিটি নিজেরাই অনুমোদন করেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিসিবি পরিচালক ইফতেখার রহমান মিঠু দৈনিক আমার দেশকে বলেন, ‘ক্লাবগুলোর কমিটি গঠনে করা স্বাক্ষর নিয়ে ঝামেলা আছে। কোথাও শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদক, আবার কোথাও শুধুমাত্র সভাপতির স্বাক্ষর আছে। তাতে এই চারটি ক্লাবের মালিকানা নিয়ে বেশ একাধিক পক্ষ তৈরি হয়েছে।’ এছাড়া ক্লাবগুলোর প্যাট্রনের ব্যাপারে বলেন, ‘এখানেও স্বাক্ষরজনিত জটিলতা আছে। আমরা চেষ্টা করছি, সবকিছু পরীক্ষা করে দ্রুত মূল মালিকের কাছে হস্তান্তর করতে।’
লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার দেওয়া চিঠির পরপরই বিসিবিতে চিঠি দেন চারটি ক্লাবের মালিকানা দাবি করা তানভীর আহমেদ। গত বছরের ১ অক্টোবর চিঠির সঙ্গে মালিকানা দলিল, সবশেষ কমিটিসহ কাগজপত্র জমা দেন। মালিকানা সম্পর্কিত জটিলতা সমাধান করেন বিসিবির তৎকালীন সভাপতি ফারুক আহমেদ। তদন্ত করে মূল মালিক হিসেবে তানভীর আহমেদকে ক্লাব বুঝিয়ে দেয়। পাশাপাশি, ক্লাবগুলোকে ২০২৪-২৫ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেট লিগে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। লিগে অংশ নিয়ে বুঝে পায় নিজেদের অংশগ্রহণ ফি।
গত বছরে নিষ্পত্তি হওয়া এই জটিলতা ফের শুরু হয় চলতি মাসের শুরুতে বিসিবি এই চার ক্লাবকে কাউন্সিলর মনোনয়ন ফরম না পাঠালে। বিসিবি আইন পরামর্শকের পরামর্শে ক্লাব চারটিকে কাউন্সিলর ফরম পাঠায়নি। এর মধ্যে গত লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে প্যাট্রন দাবি করে ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা ক্রিকেট ক্লাব অরগানাইজার্স অ্যাসোসিয়েশন বিসিবিকে কাউন্সিলরশিপ ফরম তাকে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে ক্লাবগুলোর মালিকানায় থাকা তানভীর আহমেদের দাবি, কাগজ জালিয়াতি করে নিজেকে প্যাট্রন দাবি করছেন লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। এই ব্যাপারে লোকমান দৈনিক আমার দেশকে বলেন, ‘গত বছর তাকে প্যাট্রন করা হয়েছে ক্লাবগুলোর। ২০২২ ও ২০২৩ সালের কমিটিসহ তার কাছে কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে।’
ঢাকা রেঞ্জার্সের সভাপতি নুরুজ্জামান নিয়ন ও গোল্ডেন ঈগলের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম শুভ্র ক্লাবের সঙ্গে জড়িত থাকার ব্যাপারটি স্বীকার করে বিস্তারিত কিছু বলেননি। অন্যদিকে ঢাকা রেঞ্জার্সের সাধারণ সম্পাদক আকিব ইবনে আজাদ কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। গোল্ডেন ঈগলের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ঢাকা স্পার্টান্সের সভাপতি হিসেবে নাম থাকা মারুফ হাসান জানান, ক্লাব কিংবা ক্রিকেট সম্পর্কে কিছু জানেন না। সাধারণ সম্পাদক পুলক দেবনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ব্লুজ ক্রিকেটার্সের সভাপতি হিসেবে থাকা মোহাইমিনুল ইসলাম কৌশিক ক্লাব সম্পর্কিত বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি নন। সাধারণ সম্পাদক নিশান সাকিব খান সরকার পতনের পর থেকে দেশের বাইরে আছেন। এই চার ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যারা লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে প্যাট্রন হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে স্বাক্ষর করেছেন তারা সবাই ছিলেন বেক্সিমকোর কর্মকর্তা। তারা কিভাবে ও কখন ক্লাবের দায়িত্ব পেলেন কিংবা ক্লাব চালিয়েছেন তা জানাতে রাজি ছিলেন না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

