৮.৩ ওভার, ৫ উইকেট, ৩৫ রান। জাকের আলী ও তাওহীদ হৃদয় যখন জুটি বাঁধেন, তখন বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডের অবস্থা এটা। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের পাশাপাশি ব্যর্থতার খাতায় মিডল অর্ডার। তাতে মনে হচ্ছিল অল্পতেই বাংলাদেশের গুটিয়ে যাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার। শুধু দর্শক কিংবা সমর্থকরাই এমন ভাবেননি, স্বয়ং ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররাও তেমনটা ভেবেছেন। বাংলাদেশের ইনিংস শেষে ব্রডকাস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অক্ষর প্যাটেল বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি আউট করতে পারব। সেটা না হওয়ায় খানিকটা হতাশ। দ্রুত অলআউট করতে পারলে লক্ষ্যটা ছোট হতো।’
ভারতীয় ক্রিকেটারদের এই আশা পূর্ণ হয়নি মূলত ৬ষ্ঠ উইকেটে জাকের আলী অনিক ও তাওহীদ হৃদয় জুটির কল্যাণে। দুজনে রেকর্ড ১৫৪ রান যোগ করে ৬ষ্ঠ উইকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের জুটি গড়েন। এই জুটি গড়ার পথে ২০৬ বল খেলেছেন তারা দুজনে। এতেই স্পষ্ট কতটা ধীরগতিতে এগিয়েছেন তারা। অবশ্য উইকেট বিবেচনায় ঠিক এটাই করতে হতো বাংলাদেশের টপ কিংবা মিডল অর্ডারকেও। উইকেট যে খানিকটা ধীরগতির ছিল, সেটা স্বীকার করেন ভারতীয় স্পিনার অক্ষর। তিনি বলেন, ‘উইকেট শুরুর দিকে ধীর ছিল। এই উইকেটে নতুন বলে ব্যাটিং করা কঠিন।’
সেই ভুলটা করেই বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশের টপ অর্ডার। সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম- এই তিন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের শরীরী ভাষায় ছিল আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমা। তানজিদ তামিম কিংবা মেহেদি হাসান মিরাজও তাদের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন না কোনো অংশেই। তাতেই শুরুর ধাক্কায় ৩৫ রানে বাংলাদেশ হারায় ৫ উইকেট। বিধ্বস্ত দলকে এগিয়ে নিতে নেমে জাকের-হৃদয় আর ওই পথে পা বাড়াননি। বরং দেখেশুনে খেলে বড় করেছেন নিজেদের ইনিংস। যার প্রমাণ জাকের আলী তার দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরি পেয়েছেন ৮৭তম বলে এসে। অথচ এই জাকেরই কি না সুযোগ পেলে উইকেটে চার-ছক্কার ফুলঝুরি ফোটান। ৮৭তম বলে হাফ সেঞ্চুরি পাওয়া জাকের শেষ পর্যন্ত থামেন ৬৮ রানে। এই রান করতে তার খেলতে হয়েছে ১১৪ বল আর ইনিংসে বাউন্ডারি ছিল মোটে চারটি।
জাকেরের দেখানো এই পথে হেঁটেছেন তরুণ তাওহীদ হৃদয়ও। রয়েসয়ে ইনিংস সাজানো হৃদয়ের ইনিংস থামে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির পর। এর আগে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ৮৫তম বলে এসে। আর সেঞ্চুরি পূর্ণ করার সময় তার নামের পাশে ছিল ১১৪ বল। অর্থাৎ, শেষ ৫০ রান করতে হৃদয় খেলেছেন মোটে ২৯ বল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাট হাতে ঝড় তোলার আভাস দেওয়া হৃদয়ের ব্যাটে আসতে পারত আরও বেশি রান। ৭ম ওভারে ব্যাটিংয়ে নামা হৃদয় ৪০ ওভারের পর থেকে ঠিকঠাক হাঁটতেই পারছিলেন না। লম্বা সময় ধরে ব্যাটিং করা হৃদয়ের পায়ে ক্র্যাম্প হওয়ায় দৌড়ে ঠিকঠাক প্রান্ত বদল করতে পারছিলেন না। তাতে রানের গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে আসে। আর ৪৫ ওভারের পর থেকে মোটামুটি হেঁটে হেঁটে প্রান্ত বদল করেছেন হৃদয়। দলের হয়ে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলার পথে বেশ কবার ফিজিওর কাছে চিকিৎসা নেন। তবুও ব্যাটিংয়ের সময় ঠিকঠাক দৌড়াতে না পারায় স্কোরবোর্ডে খানিকটা কম রান উঠেছে।
১১৮ বলে ঠিক শতরান করা হৃদয়ের এই ইনিংসে ছিল ৬ চার ও দুই ছক্কা। এই সেঞ্চুরিতে হয়েছে একটি দারুণ রেকর্ডও। তামিম ইকবালের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি অভিষেকে সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন হৃদয়। আর সব মিলিয়ে এটি নবম ঘটনা। ২০০২ সালে ওপেনারদের বাইরে গিয়ে অভিষেকে সেঞ্চুরি করেছিলেন ভারতের মোহাম্মদ কাইফ। দীর্ঘ ২৩ বছর পর হৃদয় ওপেনারদের বাইরে গিয়ে অভিষেকে সেঞ্চুরি করলেন।
হৃদয়-জাকেরের এমন দারুণ প্রতিরোধে বাংলাদেশের ইনিংস থামে ২২৮ রানে। তাদের দুজনের ওই প্রতিরোধের পর রিশাদ হোসেন খানিকটা ঝড় তুলে ১২ বলে করেন ১৮ রান। হৃদয়-জাকের কৃতিত্বের দিনে ভারতীয় পেসার মোহাম্মদ শামি পেয়েছেন ফাইফারের দেখা। একইদিনে দ্বিতীয় দ্রুততম হিসাবে ২০০ ওয়ানডে শিকারের কীর্তিও গড়েন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

