প্রসঙ্গ : ওয়ানডে অধিনায়কত্ব

মিরাজের বিদায়ঘণ্টা, লিটনের অপেক্ষা

মিরাজের বিদায়ঘণ্টা, লিটনের অপেক্ষা

আজ বুধবারের বিসিবি বোর্ড সভা কি শুধু একটি নিয়মিত প্রশাসনিক বৈঠক, নাকি বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা? মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজকের সভা ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনাই এখন মেহেদি হাসান মিরাজের অধিনায়কত্ব। তার হাত থেকে সরে যেতে পারে ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব, আর সে দায়িত্ব উঠতে পারে বর্তমান টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসের হাতে। আপাত সরল অঙ্কের হিসাবটা এমনই।

বোর্ড সভায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। সিদ্ধান্ত হলে বাংলাদেশ ক্রিকেট আবারও ফিরে যাবে দুই অধিনায়কের কাঠামোয়—টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্ত, আর সাদা বলের দুই সংস্করণে লিটন দাস।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিবির একাধিক পরিচালক জানিয়েছেন, অধিনায়ক পরিবর্তনের বিষয়টি মূলত টিম অপারেশন্স কমিটির এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। আর এ কমিটির চেয়ারম্যান স্বয়ং বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়, সেটি হবে ক্রিকেটীয় মূল্যায়ন ও যুক্তির নিরিখেই।

পরিচালকদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৭ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এখনই ওয়ানডে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা উচিত। তাদের মতে, একজন অধিনায়কের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু কৌশলগত নেতৃত্ব নয়, নিজের পারফরম্যান্স দিয়েও দলকে সামনে থেকে টেনে নেওয়া। সে জায়গায় মেহেদি হাসান মিরাজ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে বিসিবির এক পরিচালক বলছিলেন, ‘মিরাজের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে এখন পর্যন্ত সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বিশ্বকাপের আগে যদি পরিবর্তন আনতেই হয়, তাহলে সেটি এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।’

মিরাজের নাজুক পরিসংখ্যানই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

মিরাজ ২০২৫ সালের জুনে ওয়ানডে দলের অধিনায়ক হন। এরপর এখন পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন ২৪ ম্যাচে।

এ ২৪ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় মাত্র ১০টি। হার ১৩টি, একটি ম্যাচ টাই।

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও অধিনায়কের মর্যাদার সঙ্গে খুব একটা মানানসই নয়। ব্যাট হাতে করেছেন মাত্র ৪৯০ রান, গড় ২৭.২২। হাফ সেঞ্চুরি মাত্র চারটি; কোনো সেঞ্চুরি নেই।

বল হাতেও খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। ২৪ ম্যাচে শিকার ২৪ উইকেট। সেরা বোলিং ২৯ রানে তিন উইকেট।

একজন অধিনায়কের কাছ থেকে যে ধরনের ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করা হয়, সে মানদণ্ডে এ পরিসংখ্যানকে সন্তোষজনক ভাবার কোনো উপায় নেই।

বিদেশের মাটিতে মেহেদি মিরাজের এই সামগ্রিক পারফরম্যান্স আরো বিবর্ণ। দেশের মাটিতে কিছু সাফল্য থাকলেও বিদেশে মিরাজের নেতৃত্বের চিত্র আরো হতাশাজনক।

বিদেশের মাটিতে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলেছে ১৩ ওয়ানডে। জিতেছে মাত্র দুটি। সবশেষ জিম্বাবুয়ে সফরেও সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ। ব্যক্তিগতভাবেও ব্যাট-বলে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি তিনি।

বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের আগে এমন রেকর্ড আত্মবিশ্বাস জোগানোর বদলে উল্টো উদ্বেগই বাড়াচ্ছে।

পরিচালকদের অনেকেই আরো একটি বিষয় সামনে আনছেন। তাদের ভাষ্য, এক বছর আগে নাজমুল হোসেন শান্তকে যেভাবে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে সরানো হয়েছিল, সেটিই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত; আরো বড় কথা হলো ‘ভুল প্রক্রিয়া’।

শান্তর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়কের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলÑসেটিকে এখন অনেকেই সফল পরীক্ষা বলে মনে করছেন না।

বোর্ডের এক পরিচালক বলেন, ‘শান্তকে সরানোর প্রক্রিয়াটা ঠিক ছিল না। এখন বাস্তবতা বুঝেই আবার আগের কাঠামোয় ফেরার চিন্তা করা হচ্ছে।’

অধিনায়ক নির্বাচনের বিষয়টি ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগের সুপারিশেই হয়ে থাকে। সে বিভাগের দায়িত্ব এখন তামিম ইকবালের হাতে।

বাংলাদেশের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে তামিম নিজেই দীর্ঘদিন দল পরিচালনা করেছেন। বর্তমান দলের অধিকাংশ ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলেছেন, তাদের শক্তি-দুর্বলতা খুব কাছ থেকে জানেন। ফলে নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে তার মূল্যায়নকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বোর্ডের অনেকে।

ওয়ানডে অধিনায়ককের চেয়ার নিয়ে এই আলোচনায় তাওহিদ হৃদয়ের নামও রয়েছে এক কোণে। টি-টোয়েন্টিতে লিটন দাসের ডেপুটি হিসেবে ইতোমধ্যে কাজ করছেন তাওহিদ হৃদয়। ওয়ানডেতেও তাকে সহ-অধিনায়ক করা হতে পারেÑএমন চিন্তাও চলছে বিসিবির টপ ম্যানেজমেন্টে।

জিম্বাবুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি সিরিজে নেতৃত্ব দিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন হৃদয়। ভবিষ্যতের অধিনায়কত্বের সম্ভাবনাও তাকে বিবেচনায় রাখছে বোর্ড।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে দুই কিংবা তিন অধিনায়কের মডেল নতুন নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাঠামো অনুসরণ করেছে বিসিবি।

তবে এবার বোর্ডের ভাবনা স্পষ্ট—টেস্টের জন্য একজন, সাদা বলের দুই সংস্করণের জন্য আরেকজন। অর্থাৎ, টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্ত, আর ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে লিটন দাস।

এতে নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা যেমন বাড়বে, তেমনি বিশ্বকাপের আগে দলকে একটি পরিষ্কার দিকনির্দেশনাও দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেষ পর্যন্ত আজকের বোর্ড সভায় কী হয়Ñসেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। যদি ওয়ানডে অধিনায়ক বদলের বিষয়টি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে আজ বুধবার শুধু একটি বোর্ড সভার দিন হিসেবেই নয়, বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে নেতৃত্ব বদলের দিন হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর যদি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাবে মিরাজ কি আরেকটি সুযোগ পেলেন, নাকি কেবল বিদায়ের দিনটি কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে গেল।

উত্তরটা জানেন আপাতত একজনÑতামিম ইকবাল!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন