নাহিদ, শরিফুল, লিটন, তানজিম, মোস্তাফিজ ইনজুরিতে

সেরা অস্ত্র ছাড়াই বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফর!

সেরা অস্ত্র ছাড়াই বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফর!

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেট। প্রায় দুই দশকের অপেক্ষা। বাংলাদেশের জন্য এমন একটি সফর, যেটি শুধু আরেকটি বিদেশ সফর নয়; বরং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের বিরল সুযোগ। অথচ সেই ঐতিহাসিক যাত্রার ঠিক আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটিই হারিয়ে গেল।

নাহিদ রানা এই সিরিজে নেই! এই একটি বাক্যই যেন বদলে দিয়েছে পুরো সিরিজের সমীকরণ।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রশ্নটা শুধু একজন ক্রিকেটারের ইনজুরি নিয়ে নয়। প্রশ্নটা পরিকল্পনার। প্রশ্নটা দূরদর্শিতার। প্রশ্নটা ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের। আর প্রশ্নটা আরো বড়—জিম্বাবুয়ের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান পেস সম্পদকে খেলানোর প্রয়োজন ছিল কি?

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে নাহিদ রানাকে না পাওয়ায় এখন এই প্রশ্ন কেবল দুঃখ বাড়াচ্ছে!

ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতির ধারাবাহিক বোলিং, নতুন বলে আগ্রাসী স্পেল, পুরোনো বলে রিভার্স সুইং এবং দীর্ঘ স্পেলে একই তীব্রতা ধরে রাখার বিরল ক্ষমতা নাহিদ রানাকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর পেস বোলারের মর্যাদা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও তাকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফাস্ট বোলারদের একজন হিসেবে দেখছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কিংবা সাম্প্রতিক টেস্টগুলোয় তার পারফরম্যান্সই ছিল বাংলাদেশের পেস বিপ্লবের মুখ।

অস্ট্রেলিয়ার মতো কন্ডিশনে যেখানে অতিরিক্ত বাউন্স ও গতি সবচেয়ে বড় অস্ত্র, সেখানে নাহিদই হতে পারতেন বাংলাদেশের ট্রাম্প কার্ড। কিন্তু সেই অস্ত্র এখন ব্যবহারের সুযোগই পেল না বাংলাদেশ!

১৭ জুলাই জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ম্যাচে বাঁ পাশের পেশিতে চোট পান নাহিদ। পরবর্তী এমআরআই স্ক্যানে ধরা পড়ে গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন। বিসিবির মেডিকেল বিভাগের হিসাবে টিস্যু পুনরুদ্ধারে সময় চার সপ্তাহ। এরপর ধাপে ধাপে বোলিং ওয়ার্কলোড বাড়াতে লাগবে আরো দুই থেকে চার সপ্তাহ। অর্থাৎ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে সময় লাগবে ছয় থেকে আট সপ্তাহ। অন্তত এক মাস সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে তাকে। এরপর শুরু হবে দীর্ঘ পুনর্বাসন। সময়ের এই হিসাব জানাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের পুরো টেস্ট সিরিজেই তিনি দর্শক। টিভির পর্দায় খেলা দেখেই তাকে আফসোস মেটাতে হবে!

প্রশ্ন হলো, এই ইনজুরিকে শুধুই দুর্ভাগ্য বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় কি? বাংলাদেশ ক্রিকেট কি আগেভাগেই বুঝতে পারেনি সামনে অপেক্ষা করছে বহুলপ্রতীক্ষিত অস্ট্রেলিয়া সফর?

যে সফরের জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ২০ বছর, সেই সফরের আগে দেশের এক নম্বর পেসারকে কি আরও যত্নে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল না?

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটি ছিল তুলনামূলক কম গুরুত্বের। প্রতিপক্ষের শক্তি, সিরিজের গুরুত্ব এবং সামনে অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন সফর—সবকিছু বিবেচনা করলে নাহিদকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখার যৌক্তিকতাও কম ছিল না।

বিশ্ব ক্রিকেটের বড় দলগুলো তাদের প্রধান ফাস্ট বোলারদের ক্ষেত্রেই তো এমন পরিকল্পনা করে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত কিংবা নিউজিল্যান্ড—প্রতিটি বোর্ডই গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে ফাস্ট বোলারদের ওয়ার্ক লোড হিসাব করে। কখন খেলবেন, কত ওভার করবেন, কোন সিরিজে বিশ্রাম পাবেন—সবই নির্ধারিত থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়।

নাহিদ রানার ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনা কোথায় ছিল? ফাস্ট বোলারদের শরীর সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করে। বিশেষ করে ১৪৫ থেকে ১৫০ কিলোমিটার গতিতে নিয়মিত বল করা একজন বোলারের ক্ষেত্রে প্রতিটি স্পেলই শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

নাহিদ রানার মতো সম্পদকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে বড় বিষয় হওয়া উচিত ছিল ম্যানেজমেন্ট, শুধু ম্যাচ খেলানো নয়।

তিনি কি অতিরিক্ত বোলিং করেছেন? ম্যাচের মাঝেও কি তার শারীরিক ক্লান্তির কোনো লক্ষণ ছিল? মেডিকেল বিভাগ, কোচিং স্টাফ এবং টিম ম্যানেজমেন্টের মধ্যে সমন্বয়ে কোথাও কি ঘাটতি ছিল? তার এই ইনজুরি তাহলে কেবল দুর্ভাগ্য নয়; যথাযথ পরিকল্পনার ব্যর্থতাও।

নাহিদের পর দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছেন শরিফুল ইসলাম। হ্যামস্ট্রিংয়ে গ্রেড-১ চোট পাওয়া এই বাঁহাতি পেসার পুনর্বাসনে থাকলেও প্রথম টেস্টে খেলার সম্ভাবনা খুবই কম। দ্বিতীয় টেস্টের আগে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে তবেই তার ফেরার সুযোগ তৈরি হবে।

একই পরিস্থিতি লিটন কুমার দাসের। বাঁ পায়ের কাফ মাসলের চোটের চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে পিআরপি নিয়েছেন। ১৩ আগস্টের আগে তাকে পুরোপুরি ফিট ঘোষণা করা সম্ভব নয়। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্ট সেদিনই শুরু। সিরিজের প্রথম টেস্টের পরিকল্পনার বাইরে থাকছেন লিটন দাসও।

দলের আরেক পেসার হাসান সাকিবের চোট আরো দীর্ঘমেয়াদি। ফ্র্যাকচার থেকে ফিরতে বছরের শেষ ভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

মোস্তাফিজুর রহমানও এখনো পুনর্বাসন পর্যায়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে ১৮ আগস্টের পরই কেবল পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারবেন।

যে পেস আক্রমণ একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বে ঘোষিত দলে অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে থাকতে একটি পয়েন্টও হারাতে রাজি নয় তারা।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা হওয়ার কথা ছিল নাহিদ রানা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের আগে সেই অস্ত্রই হারিয়ে ফেলেছে দল।

এ কারণেই এখন প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি অস্ট্রেলিয়া সফরের কথা ভেবে যথেষ্ট দূরদর্শী ছিল? যদি নাহিদকে জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে বিশ্রাম দেওয়া হতো, তাহলে কি আজ তাকে পুরোপুরি সতেজ অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া যেত? নিশ্চিত উত্তর হয়তো কারো কাছে নেই।

কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যাবে।

পরিকল্পনা শুধু বর্তমানকে নিয়ে নয়, ভবিষ্যতের জন্যও করতে হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন