ছয়দিন আগের কথা। ডারউইনের প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৩ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। সমালোচনার ঝড় তখন তুঙ্গে। সিরিজ শুরুর আগেই অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে আরেকটি সাদামাটা সফর বা আরেকটি দুই-আড়াই দিনে শেষ হওয়া টেস্ট ম্যাচের ব্যর্থ কাহিনি!
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে সেই ধারণা বদলে দিল বাংলাদেশ। টেস্ট সিরিজের প্রথম দিনই ব্যাটে-বলে পুরো দাপট দেখাল। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশ যা করে দেখাল, তা রীতিমতো ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে নিজেরা মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে তুলেছে ৯৬ রান। দিনের হিসাবে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে স্রেফ ১০২ রানে; কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে। চোখে এখন সবুজ স্বপ্নÑলিড নেওয়ার!
এই টেস্ট ম্যাচের প্রথম দিনের নায়ক একজনইÑহাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট শিকার তার। টেস্টে এটিই তার ক্যারিয়ারসেরা বোলিং। ভারত ও পাকিস্তানের মাটিতে ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের আগের কৃতিত্বের সঙ্গে এবার সংযোজন হলো অস্ট্রেলিয়া। ডারউইনে তার ৫৫ রানে ৬ উইকেট অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যে কোনো ফরমেটে বাংলাদেশের কোনো বোলারের প্রথম ৫ উইকেটের কীর্তি।
শুরুটা তিনি করেছিলেন ধৈর্য দিয়ে। জেইক ওয়েদারল্ড আর ট্রাভিস হেডকে বেশ কিছুক্ষণ আটকে রাখলেন লাইন-লেংথে। তারপর একে একে ভাঙলেন সব প্রতিরোধ। ওয়েদারল্ডকে বাইরের বলে খোঁচা মেরে কট বিহাইন্ড করলেন, হেডকে ফেরালেন রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে স্টাম্প উপড়ে। মাঝে খানিকটা বিরতি নিলেও চা-বিরতির আগে কামিন্সকে ফিরিয়ে আবার আঘাত হানেন। শেষ পর্যন্ত স্টার্ক আর স্মিথকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গুটিয়ে দেন ২০০-এর নিচে।
সঙ্গী তাসকিন আহমেদ আর ইবাদত হোসেন চৌধুরীও কম যাননি। দুজনই নিয়েছেন দুটি করে উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার ১০ উইকেটের সবগুলোই বাংলাদেশের পেসারদের ঝুলিতে; টেস্ট ইতিহাসে যা বাংলাদেশের জন্য মাত্র দ্বিতীয়বার। এ ঘটনার প্রথম সাক্ষী ছিল রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট।
ইবাদতের গল্পটা আলাদা করে বলার দাবি রাখে। এ সফরে তার থাকারই কথা ছিল না। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সঙ্গ দিতে ইতালিতে ছুটি কাটাচ্ছিলেন তিনি। নাহিদ রানা আর শরিফুল ইসলামের চোট বদলে দেয় সব হিসাব। জরুরি তলব পেয়ে ছুটে আসেন বাংলাদেশ দলে। মার্নাস লাবুশেনকে ফিরিয়ে যেভাবে এয়ার ফোর্স স্যালুট দিলেন, তাতে বোঝা গেল এমন সাফল্যের জন্য কতটা মরিয়া ছিলেন তিনি। পেছনের সময়টা তার ভালো যাচ্ছিল না। ডারউইনে খেলতে নামার আগের ৫ টেস্টে তার উইকেট শিকার ছিল মাত্র ১টি! এখানে প্রথম ইনিংসে ১১ ওভারে ৩৯ রানে ২ উইকেট নিয়ে সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার কসরতে ইবাদত।
ডারউইনে প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র সান্ত্বনা স্টিভেন স্মিথ। ৭১ রানের ইনিংসে একাই দলকে টানেন তিনি। যদিও শুরুটা সহজ ছিল না তার জন্য। ২ রানে স্লিপে তার ক্যাচ ফেলে দেন তানজিদ তামিম। ৭ রানের সময় বেঁচে যান রিভিউতে, টেকনোলজির কল্যাণে! সম্ভাব্য রানআউট থেকেও একবার বাঁচলেন। এতগুলো সৌভাগ্যের পরশে অ্যালেক্স ক্যারির সঙ্গে গড়েন ৫৫ রানের জুটি, অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র ৫০ ছোঁয়া পার্টনারশিপ। কিন্তু ওই জুটি ভাঙার পরই ফের চেপে বসে বাংলাদেশ। ইবাদত ফেরান ক্যারিকে, তাসকিন দিনের সেরা ডেলিভারিতে উপড়ে ফেলেন ওয়েবস্টারের অফস্টাম্প। শেষে হাসানের হাতেই কাটা পড়েন স্মিথ নিজে, বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে ফেরেন।
বোলিংয়ে দুরন্ত সময়ের পর ব্যাটিংয়েও বেশ দেখাল বাংলাদেশ। প্রাণবন্ত উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণকে ঠেকিয়ে দিল দক্ষতার সঙ্গে। বাংলাদেশের টপ অর্ডার দেখাল পরিণত ব্যাটিং। শুরুতে একটা জীবন পান তানজিদ হাসান, নাথান লায়নের হাত ফসকে যায় তার ক্যাচ। এরপর সাদমান ইসলামের সঙ্গে গড়েন ৪৫ রানের উদ্বোধনী জুটি। সাদমান ফেরেন ২০ রানে। এরপর অবশ্য আর ভুল করেননি তানজিদ আর মুমিনুল হক। দিন শেষে তানজিদ অপরাজিত ছিলেন ৩২ রানে, মুমিনুল ৩৫ রানে, দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটি ৬০ রানের। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস টপকে আজ লিড নেওয়ার রঙিন স্বপ্ন সাজিয়ে দ্বিতীয় দিনের ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ।
এই টেস্টের প্রথম দিনের হিসাব-নিকাশের অঙ্ক কষলে বাংলাদেশ দাবিটা করতেই পারেÑ‘এদিনের বস আমরা।’ দিনের স্কোরকার্ডও হাত তুলে তাতে সায় দিচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (প্রথম দিন শেষে)
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস : ১৯৮/১০ (৫৩ ওভারে, হেড ২২, ওয়েদারল্ড ২৩, লাবুশেন ১, স্মিথ ৭১, গ্রিন ১৩, কেয়ারি ১৯, ওয়েবস্টার ১২, কামিন্স ৯, স্টার্ক ১, লায়ন ৭, হেজেলউড ৪*; তাসকিন ২/৫৫২, মাহমুদ ৬/৫৫, ইবাদত ২/৩৯, মিরাজ ০/১২, তাইজুল ০/২৪)।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ৯৬/১ (২৪ ওভারে, সাদমান ২০, তানজিদ ৩২*, মুমিনুল ৩৫*; স্টার্ক ১/২৮)।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

