ইতিহাসের অন্যতম সেরা আর মহিমান্বিত এক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি দেখল ফুটবল দুনিয়া। তা আবার সবচেয়ে বড় ট্রফিটি ছাড়াই। তাইতো ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এর ম্যাচে প্রতিবেশী স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাঠ ছাড়লেন পর্তুগিজ মহানায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। টেক্সাসের ডালাসে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর জয়সূচক গোলটি পর্তুগালকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়, আর সে সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ৪১ বছর বয়সি রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের শেষ স্বপ্নও!
পাঁচবার ব্যালন ডি’অর, পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ, ২০১৬ সালের ইউরোজয়ী রোনালদোর আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ক্যারিয়ার মিলিয়ে গোলসংখ্যা রেকর্ড ৯৭৬টি। বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয় বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তিও গড়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের ট্রফিটি তার জন্য অধরাই থেকে গেল। ২০০৬ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তোলাই ছিল বিশ্বমঞ্চে তার সর্বোচ্চ সাফল্য।
এটিই যে তার শেষ বিশ্বকাপ, তা রোনালদো আগেই ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও
বিদায়ী বিশ্বকাপের বিদায়ী ম্যাচ শেষে আবেগঘন কণ্ঠে এই তারকা জানিয়ে রেখেছেন, ‘আমি পরিবারের সঙ্গে দেখা করব এবং একদম শান্ত মাথায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
রোনালদোর মতো একজন মহাতারকাকে প্রতিটি ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলানোর চাপ পর্তুগালের জয়ের সম্ভাবনাকে ব্যাহত করেছে কি না—তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে চলছে তুমুল বিতর্ক। বিবিসির পণ্ডিত ও ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেজের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘রোনালদো মাঠের মধ্যে একজন দাদুর মতো হেলেদুলে হাঁটছিল, আর এ কারণেই পর্তুগাল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পুরো ম্যাচে কিছুই করেনি। মার্তিনেজ কেন একজন খেলোয়াড়ের সামনে এভাবে আত্মসমর্পণ করলেন? পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে শুধু কোচের ভুলের কারণেই।’
যদিও বিদায়ী কোচ মার্তিনেজ রোনালদোর পাশেই দাঁড়িয়েছেন। ম্যাচ শেষেই পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া এই কোচ বলেন, ‘এ বিশ্বকাপে রোনালদো যা করার চেষ্টা করেছে, তার জন্য তাকে ধন্যবাদ। একজন অ্যাথলেটের পেছনে থাকা দারুণ এক মানুষের সেরা উদাহরণ সে।’
পর্তুগালের হয়ে রেকর্ড ১৪৬ গোল করা এই ফরোয়ার্ডকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সমালোচকরা বলে আসছিলেন যে, গোল করা ছাড়া দলে তার অবদান রাখার সক্ষমতা কমে গেছে অনেকটাই। এবারের বিশ্বকাপে তার কিছু পরিসংখ্যান সে দাবিকেই যেন সত্য প্রমাণ করে।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে সিআর সেভেন তিনটি গোল করেছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে উপহার দিয়েছেন জোড়া গোল। আর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল পেয়েছেন একটি। তবে এ তিনটি গোলের জন্য শট নিয়েছেন ১৮টি। মজার ব্যাপার হলো, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সঙ্গে টুর্নামেন্টের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা আর্লিং হালান্ডও সাত গোল করেছেন ঠিক ১৮ শটই নিয়েই। এখন পর্যন্ত এ আসরে ১০ ফুটবলার রোনালদোর চেয়ে বেশি গোল করেছেন। কিন্তু তারচেয়ে বেশি শট নিয়েছেন মাত্র চারজন।
পাঁচ ম্যাচে বলা যায় পুরো সময় মাঠে ছিলেন রোনালদো। খেলেননি মাত্র ৯ মিনিট। কিন্তু সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন মাত্র একটি। এমনকি পুরো বিশ্বকাপে ৩৬৬ জন খেলোয়াড় তারচেয়ে বেশিবার বল স্পর্শ করেছেন।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নকআউট পর্বে তার গোল মাত্র একটি, যা এবারের আসরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে এসেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, গত বিশ্বকাপে যেখানে গনসালো রামোস নকআউট পর্বে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, সেখানে মার্তিনেজ কেন এসি মিলানের এই ফরোয়ার্ডকে পুরো ম্যাচ বেঞ্চে বসিয়ে রাখলেন?
রোনালদো ও লিওনেল মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফুটবল দুনিয়ার তাবত ভক্ত দুটি ভাগে বিভক্ত। কিন্তু ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে ট্রফি জিতে মেসি নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শতাব্দীর দুই সেরা ফুটবলার ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে আর স্বদেশি লিজেন্ড ডিয়েগো ম্যারাডোনার কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন এই ফুটবল জাদুকর। এবারের (২০২৬) বিশ্বকাপেও ইন্টার মিয়ামির মেসি যেখানে সাত গোল করে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন, সেখানে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে রোনালদো খেলেও বিশ্বকাপে আগের মতো প্রভাব ফেলতে পারেননি।
রোনালদোর সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সতীর্থ ওয়েন রুনি বিষয়টিকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, ‘সে একজন জিনিয়াস, একজন সুপারস্টার। কিন্তু সময় কাউকেই ক্ষমা করে না। সে বিশ্বাস করেছিল এ টুর্নামেন্ট জিততে পারবে। এটি ফুটবলের জন্য একটি অত্যন্ত দুঃখের দিন।’
খেলার ফল যা-ই হোক না কেন, পর্তুগিজ সমর্থকদের কাছে রোনালদো সব সময় একজন নায়ক হয়েই থাকবেন। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত এক ভক্ত বলেন, ‘রোনালদো আমাদের যা দিয়েছে, তা অত্যন্ত সুন্দর। আজ আমাদের কাঁদার প্রয়োজন নেই, আমাদের হাসিমুখে তাকে বিদায় জানানো উচিত; কারণ আমরা তাকে লাইভ খেলতে দেখেছি।’
একটি যুগের অবসান হলো। সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছাড়াই পর্দা নামল বিশ্বের অন্যতম সেরা এই গ্রেট ফুটবলারের বর্ণিল ক্যারিয়ারে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে-এতে কোনো সন্দেহ নেই!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

