বাংলাদেশ ০, উত্তর কোরিয়া ১০

কোরিয়া খেলল, গোল করল বাংলাদেশ দেখল, গোল খেল

কোরিয়া খেলল, গোল করল 
বাংলাদেশ দেখল, গোল খেল

ম্যাচের প্রথম গোলটা হলো ৫ মিনিটের মাথায়। খেলার ৯০ মিনিটের সময় হলো শেষ গোলটা। ভাবছেন এটাই শেষ! তাহলে আপনি ভুল, বড় ভুল! শুরু ও শেষের গোলের মাঝখানে আরো আটটা গোল হলো। ম্যাচের ফল—বাংলাদেশ ০, উত্তর কোরিয়া ১০!

বাংলাদেশ নারী দল এই প্রথম আর আন্তর্জাতিক কোনো ম্যাচে এত বেশি গোল খেল। আগের রেকর্ডটা ছিল ৯-০। ২০১৩ সালে সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল থাইল্যান্ড। তবে ছবির মতো সুন্দর ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যে শোচনীয় অবস্থা হলো সেই দুঃখ, কষ্ট এবং যন্ত্রণা ভুলতে অনেক সময় লাগবে। এশিয়ান গেমসে এই ইভেন্টই ছিল বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের প্রথম কোনো ম্যাচ।

বিজ্ঞাপন

সেই প্রথমেই বাংলাদেশ গড়িয়ে পড়ল পাহাড় থেকে একেবারে তলানিতে।

জানাই ছিল উত্তর কোরিয়া উড়ে আসবে। ঝাঁপাবে। গোলপোস্ট কাঁপাবে। কিন্তু সেই কাঁপাতে গিয়ে যে গোলপোস্ট উড়িয়ে জাল, ম্যাচ এবং পুরো বাংলাদেশ দলকেই ছিন্নভিন্ন করে দেবে—তা কে ভেবেছিল? ১০-০ গোলে হারা ম্যাচ থেকে আসলে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে।

তবে ভ্রু কুঁচকে গেল ম্যাচের আগে বাংলাদেশের সেরা একাদশ দেখে। কোচ পিটার বাটলার আগের দিনই বলেছিলেন বাস্তবতা মেনে নাও, উত্তর কোরিয়া অনেক শক্তিশালী দল। ওদের সঙ্গে জেতা যাবে না। যদি পারো কিছু শিখে নাও। সেই শেখার ম্যাচ খেলতে নেমে কোচ অভিজ্ঞ এবং সিনিয়রদের জায়গায় একাদশ সাজালেন জুনিয়রদের দিয়ে।

বাস্তবতার নামে কোচ যা করলেন, সেটা বাস্তবসম্মত নাকি হিম্মতে গলদ সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। ঋতুপর্ণা, সাগরিকা, মনিকা চাকমা, শামসুন্নাহার জুনিয়র; দলের সেরা এই চারজনই রইলেন রিজার্ভ বেঞ্চে। প্রতিপক্ষ যেখানে টানা তিনবারের এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন, সেখানে নিজেদের সেরা অস্ত্র ছাড়াই মাঠে নামানো, এটাকে অভিজ্ঞতা বিলানো বলা যায়, নাকি নিজের পায়ে কুড়াল মারা? ম্যাচের ফল বলে দিচ্ছে দ্বিতীয়টিই সত্যি। তরুণদের সুযোগ দেওয়া প্রশংসনীয় উদ্যোগ হতে পারত অন্য কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার মতো পরাশক্তির সামনে এমন পরীক্ষা আসলে ছিল আত্মঘাতী। বাটলার নিজেও বুঝেছিলেন ভুলটা, তবে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে অনেক।

তার এই পরীক্ষার ফল হলো, বিরতি পর্যন্ত বাংলাদেশ ০, কোরিয়া ৭!

৭-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে এসে কোচের মনে হলো শুরুর একাদশ ভুল হয়েছে। তাই পরের অর্ধে তিনি সিনিয়র ও অভিজ্ঞদের ফেরালেন। কিন্তু ৭ গোলে পিছিয়ে থাকার পর একটা দল সেখানেই হেরে গেছে। বাকি ৪৫ মিনিট বাংলাদেশ যা খেলল তাকে বলে হতাশা ও মাথা নুইয়ে শুধু মাঠ ছাড়ার অপেক্ষা!

কোচ যুক্তি দেখাতে পারেন, দ্বিতীয়ার্ধে আমরা ভালো খেলেছি। এই সময়ে গোল খেয়েছি ৩টি। একসময় তো মনে হয়েছিল কোরিয়ার আক্রমণে এলেই গোল। আসলেও কিন্তু তাই। অতিরিক্ত সময়সহ খেলা হয়েছে ৯৩ মিনিট। ১০ গোলের হিসাব জানাচ্ছে প্রতি ৯ মিনিটে একটি গোল। এত বেশি গোল হচ্ছে যে, উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়রা গোলের পর আর আনন্দও করছেন না! এত গোলের হিসাব রাখতে গিয়ে নোটবুকেও মিনিট, গোল ও গোলদাতার নাম টুকে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়! আর সারাক্ষণ গ্যালারি থেকে কোরিয়ান সমর্থকদের চিৎকার, উল্লাসধ্বনির বিপরীতে মাঠে বাংলাদেশের ক্লান্ত, হতাশ, ধসে যাওয়া নুয়ে পড়া চেহারাই দেখা গেল কেবল।

পুরো ম্যাচে কোরিয়ার পোস্টে একটা আক্রমণও করতে পারেনি বাংলাদেশ। ম্যাচে মাত্র দুই কী তিনবার বল ধরেন কোরিয়ান গোলকিপার। তাও আবার নিজ দলের খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আসা ব্যাকপাসের বরাতে!

বাংলাদেশি গোলকিপার মিলি আক্তার নিজের ভুলে গোল খেয়েছেন। আবার সেই সঙ্গে দারুণ দক্ষতার সঙ্গে কয়েকটি গোল একক প্রচেষ্টায় রক্ষাও করেছেন। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে সবমিলিয়ে ৭টা গোল ঠেকিয়ে দিয়েছেন তিনি। নইলে এই ম্যাচ হতে পারত ১৭-০ গোলের ভয়াবহ ম্যাচ!

কৌশল, দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা, শারীরিক শক্তি, সামর্থ্য—ফুটবল অনুষঙ্গের প্রায় সবকিছুতেই এই ম্যাচে বাংলাদেশ শূন্য পেয়েছে। বিগ জিরো!

এই ম্যাচে নামার আগে বাংলাদেশের কৌশল ছিল একটাই—যত সম্ভব কম গোল খাওয়া। গত মার্চে এই উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ৫-০ গোলে হেরেছিল দল। পাঁচ মাস পরে এসে সেই ব্যবধান দ্বিগুণ হলো, ১০-০। উন্নতি হলো নাকি অবনতি? হিসাবটা আপনি মিলিয়ে নিন।

চলতি এশিয়ান গেমসে পরের ম্যাচেও বাংলাদেশের সামনে আরেক কোরিয়ান দুঃস্বপ্ন। সেই দলের নাম দক্ষিণ কোরিয়া। খেলা ১৭ সেপ্টেম্বর, এই একই ভেন্যুতে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...