আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপ কেপ ভার্দের রূপকথা

আরিফুল হক বিজয়

আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপ কেপ ভার্দের রূপকথা

আটলান্টিকের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক দ্বীপ। নকশায় খুঁজতে গেলে হয়তো চোখ এড়িয়ে যাবে। দেশটির নাম কেপ ভার্দে। মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের একটি দেশ। বিশ্বের অনেক শহরের জনসংখ্যাও এরচেয়ে বেশি। অথচ সেই ছোট্ট দেশটিই এখন বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়। বিশ্বকাপ- যে স্বপ্নটা একসময় কেবল টেলিভিশনের পর্দায় দেখত কেপ ভার্দের শিশুরা, সেই স্বপ্নই এখন তাদের নিজের।

‘ব্লু শার্কস’! সমুদ্রঘেরা দ্বীপ দেশের ফুটবল দলটির ডাকনাম যেন তাদের গল্পের মতোই। ছোট্ট, শান্ত, অবহেলিত এক দেশ হঠাৎ করেই গর্জে উঠেছে পুরো বিশ্বের সামনে। এসওয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার রাতটা আজও ভুলতে পারেনি কেপ ভার্দে। সেদিন শহরের রাস্তাগুলোয় শুধু মানুষের ভিড়ই ছিল না, ছিল স্বপ্নের মিছিলও। পরিচিত-অপরিচিত সবাই এক হয়ে গিয়েছিল মহামঞ্চে নিজ দেশের পতাকা ওড়ানোর অপেক্ষায়। কেউ কেঁদেছেন, কেউ চিৎকার করেছেন, কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন অবিশ্বাস নিয়ে।

একসময় এ দেশে ফুটবল মানে ছিল ধুলোমাখা রাস্তায় খালি পায়ে ছুটে চলা। স্কুল শেষে বন্ধুর সঙ্গে ছোট্ট বলটিকে লাথি মেরে সূর্য ডোবা দেখা। কিন্তু এখন? ফুটবল মানে পুরো জাতির হৃৎস্পন্দন। সান্তা ক্রুজের একটি মাঠে বিকালের আলো নেমে আসে ধীরে ধীরে। সেখানে অনুশীলন করছে কিশোররা। তাদের চোখে এমন এক অদম্য ইচ্ছা, যা কেবল স্বপ্নবাজদের মধ্যেই দেখা যায়।

১৪ বছর বয়সি ইউরি মার্লে ফার্নান্দেস বলটি পায়ে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, যেন সে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে খেলছে। তার কণ্ঠে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, ‘আমি বিশ্বকাপ জিততে চাই। আমি খুব দ্রুত দৌড়াতে পারি। আমি গোল করতে পারি। আমার গোলগুলো সুন্দর।’ যেন শিশুসুলভ সরলতা! অথচ কথাগুলো পুরো কেপ ভার্দের গল্পই বলছে।

এ দেশের মানুষ জানে তারা ছোট। কিন্তু তারা এটাও শিখে গেছে যে, স্বপ্নের কোনো আয়তন হয় না। কেপ ভার্দের অনেক মানুষ দেশের বাইরে থাকে। ইউরোপ, আমেরিকা, সৌদি আরবÑপৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে তারা। কিন্তু বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার পর সবাই যেন আবার এক জায়গায় ফিরে এসেছে একটি পতাকার নিচে।

দলটির ডিফেন্ডার স্টোপিরার মা মারিয়া দা গ্রাসা সান্তোস যখন ছেলের গল্প বলছিলেন, তার চোখে ছিল গর্ব, স্বপ্ন আর আনন্দের জ্বলজ্বলে আভা। ‘এখন পুরো বিশ্ব কেপ ভার্দেকে চেনে’, তিনি বলছিলেন ধীরে ধীরে। তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা ছোট দেশ; কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ছোট নয়।’ আর তার ছেলে স্টোপিরার কণ্ঠে স্বপ্ন সত্য হওয়ার অবাক ভাষা, ‘এটা শুধু আমার স্বপ্ন নয়, এটা পুরো দেশের স্বপ্ন।’

হয়তো এ কারণেই কেপ ভার্দের গল্পটা এত আলাদা। এটা শুধু ফুটবলের গল্প নয়, এটা এমন এক দেশের গল্প, যারা সমুদ্রের মাঝখান থেকে দাঁড়িয়ে পুরো বিশ্বকে বলতে চায়—‘আমরাও পারি’। ফিফার অর্থায়নে বদলে যাচ্ছে তাদের মাঠ, একাডেমি, ভবিষ্যৎ। ফুটবল এখন সেখানে কেবল খেলা নয়; এটা নতুন জীবনের পথ, তরুণদের জন্য আশার আলো। তাদের সামনে এখন স্পেনের মতো দল। বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল। ১৫ জুন আটলান্টায় তাদের মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। স্বপ্নকে তাড়া করার নেশায় দ্বীপের মাঠগুলোতেও তাই অনুশীলন থেমে নেই। হয়তোবা থামবেও না। কেপ ভার্দের ‘স্বপ্নের তাড়না’ গল্পে যে বিরাম চিহ্ন নেই!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন