বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু গোলের গল্প নয়, এটি সৌন্দর্যেরও এক মহাকাব্য। কখনো দূরপাল্লার বজ্রগতির শট, কখনো একক নৈপুণ্যে ডিফেন্ডারদের কাঁপিয়ে দেওয়া ড্রিবল; আবার কখনো নিখুঁত পাসের বুননে তৈরি হয় শিল্পের মতো কিছু মুহূর্ত। কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের করা একটি গোল ঠিক তেমনই এক শিল্পকর্ম, যা এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে বিস্ময় জাগায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৩৫ দিন। বিশ্বকাপের আগে উন্মাদনা বাড়িয়ে দিতেই ফিফার কাউন্টডাউনে ফিরে এসেছে সেই অসাধারণ গোলের স্মৃতি।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৬-২ গোলের জয়ে জ্যাক গ্রিলিশ যে গোলটি করেছিলেন, সেটিই এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ পাসিং মুভ থেকে আসা গোল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। সেই গোলের আগে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করেছিলেন ছন্দের মতো পাসিং শিল্প, টানা ৩৫টি পাসে লেখা হয়েছে ফুটবলীয় কবিতা। ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের কোনো গোলের আগে এত দীর্ঘ ও নিখুঁত পাসিং মুভ আর কখনো দেখা যায়নি।
গোলটি ছিল যেন ধৈর্য, পরিকল্পনা আর ছন্দের এক অপূর্ব মিশ্রণ। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা বলটিকে এমনভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, যেন পুরো মাঠটিই তাদের ব্যক্তিগত ক্যানভাস। ইউরোপীয় ফুটবলের গতির রাজ্যের খেলোয়াড়রা যেন একেকজন হয়ে গিয়েছিলেন স্পেনের টিকিটাকা ছন্দের জাদুকর। প্রতিটি পাস ছিল হিসেবি, প্রতিটি স্পর্শ ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা। দর্শকের দুই চোখের পলকের সঙ্গে থেমে গিয়েছিল পৃথিবীর অজস্র সীমান্ত।
মজার বিষয় হলো, সেই আক্রমণ গড়ে তোলার সময় ইংল্যান্ডের শুরুর একাদশের সব ১১ জন ফুটবলারই বল স্পর্শ করেছিলেন। এমনকি গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও ছিলেন সেই পাসিং জালের অংশ। ডেক্লান রাইসের নেওয়া ছোট্ট একটি ফ্রিকিক থেকে শুরু হওয়া আক্রমণটি প্রায় ৮৬ সেকেন্ড ধরে চলেছিল। মাঝমাঠে পুরো মুভটির প্রাণ ছিলেন জুড বেলিংহ্যাম। তরুণ এই মিডফিল্ডার একাই দিয়েছিলেন ৯টি পাস। কখনো ছোট পাস, কখনো জায়গা বদল করে খেলা ঘোরানো—পুরো আক্রমণে তার উপস্থিতি ছিল অনবদ্য।
এক সময় বল পৌঁছে যায় ক্যালাম উইলসনের কাছে। আর নিখুঁত সময়জ্ঞান দেখিয়ে তিনি বল বাড়িয়ে দেন জ্যাক গ্রিলিশের উদ্দেশে। তখন শুধু শেষ ছোঁয়াটুকুই বাকি। সহজ এক টোকায় ইরানের জালে বল পাঠিয়ে দেন গ্রিলিশ। গোলের পর তার উদযাপনও ছিল সে মুহূর্তের মতোই আনন্দময় ও আবেগঘন।
এর আগে বিশ্বকাপে এক গোলের আগে সর্বোচ্চ ২৫টি পাসের রেকর্ড ছিল। মজার ব্যাপার হলো, সে রেকর্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার নাম। ২০০৬ বিশ্বকাপে মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনা প্রথম ২৫ পাসের মুভ থেকে গোল করেছিল। পরে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে পানামার বিপক্ষে একই কীর্তি গড়ে ইংল্যান্ড। কিন্তু কাতারের মরুভূমিতে থ্রি লায়ন্সরা নিজেদেরই সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস লেখে।
ফুটবলে অনেক গোল আসে, অনেক গোল হারিয়েও যায় সময়ের ভিড়ে। কিন্তু কিছু গোল থাকে, যেগুলো শুধুই স্কোরলাইন বদলায় না—ফুটবলের সৌন্দর্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। ইরানের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সেই ৩৫ পাসের গোল ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত, যা এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিখুঁত দলীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা উদাহরণ হয়ে আছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

