অখ্যাত দেশের ‘বিখ্যাত’ তারকারা

FB_IMG_1780466287703
আরিফুল হক বিজয়

অখ্যাত দেশের ‘বিখ্যাত’ তারকারা

২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স কিংবা স্পেনের গল্প নয়। উত্তর আমেরিকার আকাশে এবার উড়বে আরো কিছু পতাকা, যাদের ইতিহাসে বিশ্বকাপের আলো খুব বেশি ঝলমলে নয়। কিন্তু তাদের ইতিহাসে এমন কিছু নাম এসেছে, যাদের পায়ের মুহূর্তের ঝলকানি পুরো দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। নরওয়ের আরলিং হালান্ড, মিসরের মোহাম্মদ সালাহ, কানাডার আলফন্সো ডেভিস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকরা তেমনই। যারা অখ্যাত দেশের বিখ্যাত তারকা। বিশ্বকাপের নতুন সংস্করণে আন্ডারডগ দলগুলোর স্বপ্ন গড়ে উঠেছে এমন কিছু তারকার কারণে, যারা নিজেদের দেশের চেয়েও বড় পরিচিতি অর্জন করেছেন বিশ্ব ফুটবলে।

হালান্ড : নরওয়ের স্বপ্নের ‘গোলমেশিন’
আরলিং হালান্ড এখনো নরওয়ের সবচেয়ে বড় আশার নাম। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে একের পর এক গোল করে তিনি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের কাতারে নিয়ে গেছেন। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, এফএ কাপ—ইউরোপীয় ফুটবলের প্রায় সব বড় মঞ্চেই নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনো বড় কোনো গল্প লেখা হয়নি। সেই অপূর্ণতাই এবার বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। নরওয়ে হয়তো শিরোপার দাবিদার নয়, কিন্তু হালান্ড থাকলে যেকোনো ডিফেন্ডারই চিন্তিত থাকবেন। তার একটি সুযোগ, একটি ফিনিশই ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সালাহ : মিসরের মরুভূমিতে শেষ সূর্যের আলো
মোহাম্মদ সালাহর নাম এখন শুধু মিসরের নয়, পুরো আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের অংশ। লিভারপুলের হয়ে তিনি জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, এফএ কাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ অসংখ্য ট্রফি। ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তার অবস্থান প্রায় নিশ্চিত। তবে জাতীয় দলের হয়ে এখনো বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই। অনেকের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অধ্যায়। মিসরের স্বপ্ন, ভয়, আশা—সবকিছু যেন এসে জমা হয়েছে সালাহর বাঁ পায়ের ওপর।

ডেভিস : কানাডার গতির প্রতীক
আলফন্সো ডেভিস শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি কানাডিয়ান ফুটবলের বিপ্লবের মুখ। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ, বুন্দেসলিগা এবং একাধিক বড় শিরোপা জিতেছেন তিনি। তার গতি, ড্রিবলিং ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুলব্যাকে পরিণত করেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ইনজুরি নিয়ে কিছু শঙ্কা রয়েছে, তবু কানাডার বিশ্বকাপ স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ তিনিই। স্বাগতিক দর্শকদের গর্জনের মাঝে ডেভিস যদি নিজের সেরা ফুটবল খেলতে পারেন, কানাডা হতে পারে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমক।

পুলিসিক : আমেরিকার ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’
ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। এসি মিলানের তারকা এই উইঙ্গার এর আগে চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগও জিতেছেন। তাকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার হিসেবে দেখেন। ক্লাব মৌসুমটা অবশ্য ওঠানামার ছিল। গোল খরায় ভুগেছেন, সমালোচনাও শুনেছেন। তবে বিশ্বকাপের ঠিক আগে সেনেগালের বিপক্ষে গোল করে আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। স্বাগতিক দেশের অধিনায়ক হিসেবে তার কাঁধে শুধু দলের দায়িত্ব নয়, পুরো আমেরিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎও।

ইসাক, গিরাসি, আল-তামারি : নতুন গল্পের নায়করা
আলেকজান্ডার ইসাক বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে পরিপূর্ণ স্ট্রাইকারদের একজন। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের হয়ে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স সুইডেনকে দিয়েছে নতুন বিশ্বাস। সেরহু গিরাসির নাম এখন ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর গোলদাতাদের তালিকায়। গিনির হয়ে তিনি হতে পারেন আফ্রিকার অপ্রত্যাশিত বিস্ময়। অন্যদিকে মুসা আল-তামারিকে জর্ডানে ডাকা হয় ‘জর্ডানিয়ান মেসি’ নামে। তাঁর সৃজনশীলতা ও গতি জর্ডানের স্বপ্নকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

উজবেকিস্তান ও ইরাকের নতুন মুখ
উজবেকিস্তানের আবদুকোদির খুসানোভকে ইতোমধ্যে এশিয়ার অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্ডার ধরা হচ্ছে। ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা তাকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। আর আইমেন হুসেইন এশিয়ান বাছাইপর্বে গোলের পর গোল করে ইরাককে এনে দিয়েছেন নতুন আত্মবিশ্বাস। বড় ম্যাচে তাঁর শারীরিক উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।

এই তারকাদের বেশিরভাগেরই শিরোপা জেতার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসও বলে, বড় গল্প সবসময় বড় দল লেখে না। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া, ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়া, ২০২২ সালে মরক্কো—প্রতিটি বিশ্বকাপেই কেউ না কেউ সমীকরণ বদলে দিয়েছে। হয়তো ২০২৬ সালে সেই গল্প লিখবে নরওয়ে, মিসর, কানাডা কিংবা জর্ডান। আর যদি সত্যিই কোনো আন্ডারডগ দল ইতিহাস রচনা করে, তাহলে তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এই তারকারাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন