মাঝমাঠের শিল্পীর ‘দ্য লাস্ট হুইসেল’

আরিফুল হক বিজয়

মাঝমাঠের শিল্পীর ‘দ্য লাস্ট হুইসেল’

বাংলাদেশ ফুটবলের আকাশে এক সময় যে নামটি ছিল নির্ভরতার প্রতীক, যে পায়ের ছোঁয়ায় ছন্দ পেত মধ্যমাঠ—তিনি মামুনুল ইসলাম। দক্ষ মিডফিল্ডার, লড়াকু অধিনায়ক—এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ পথচলার গল্প, সংগ্রামের গল্প, আর এক অবিচল ভালোবাসার গল্প। সেই গল্পেরই শেষ অধ্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসরের পথে মামুনুল—যা কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়, বাংলাদেশের ফুটবলের এক সোনালি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় নিজের বিদায়ের কথা জানান তিনি। আজ বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির বিপক্ষে মাঠে নামবেন শেষবারের মতো—শেষবারের মতো জার্সিতে ঘাম ঝরাবেন, শেষবারের মতো দর্শকদের ভালোবাসা কুড়িয়ে নেবেন। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন ভক্তদের—এসো, দেখো, মনে রেখো।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামের এক কোণে জন্ম নেওয়া কিশোরে কৈশোরেই তুলেছিলেন ফুটবলের সুর। সময়ের সঙ্গে সেই সুর হয়ে ওঠে দৃঢ়, নিখুঁত, পরিণত। কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত পাসিং, বল নিয়ন্ত্রণ আর নেতৃত্বগুণে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব এক জগৎ—মধ্যমাঠ, যেখানে তিনি ছিলেন পরিকল্পনাকারী, ছিলেন চালিকাশক্তি। জাতীয় দলের জার্সিতে তার পথচলা যেন এক অনবদ্য উপাখ্যান। ৬৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেশের প্রতিনিধিত্ব, তিনটি গোল—সংখ্যায় হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে ছিল গভীর। ২০১৩ সাল থেকে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপ—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার উপস্থিতি ছিল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। যদিও তার ইচ্ছে ছিল লাল-সবুজ জার্সিতেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানো, বাস্তবতার সীমাবদ্ধতায় তা হয়নি। তাই ঘরোয়া লিগের ম্যাচকেই বেছে নিয়েছেন বিদায়ের মঞ্চ হিসেবে।

ঘরোয়া ফুটবলে তার পদচারণা বেশ বিস্তৃত। ব্রাদার্স ইউনিয়ন থেকে শুরু করে আবাহনী লিমিটেড ঢাকা, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, চট্টগ্রাম আবাহনী, রহমতগঞ্জ কিংবা ফর্টিস—যেখানেই গেছেন, সেখানেই হয়ে উঠেছেন ভরসার নাম। তার নেতৃত্বে এসেছে লিগ শিরোপা, ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপ—অর্জনের তালিকা দীর্ঘ, গর্বের। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে জায়গা করে নেন ইন্ডিয়ান সুপার লিগে, আতলেতিকো ডি কলকাতার জার্সিতে। সেই মুহূর্ত যেন শুধু তার নয়, পুরো দেশের ফুটবলের এক গর্বের অধ্যায়।

ক্যারিয়ারের পথে বাধাও ছিল—ইনজুরি, ফর্মহীনতা, দলবদল, আর দেশের ফুটবলের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু থেমে যাননি তিনি। প্রতিবার ফিরে এসেছেন নতুন করে, আরও দৃঢ় হয়ে। ২৮ বছর পর এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের জয়ে তার গোল—একটি মুহূর্ত, যা আজও স্মৃতির অ্যালবামে উজ্জ্বল।

মামুনুলকে নিয়ে সাবেক তারকা আবদুল গাফফার বলেন, ‘মধ্য মাঠে মামুনুল ছিলেন কৌশলী এবং কার্যকর প্লেমেকার। নিখুঁত পাস, দূরপাল্লার শট, সেটপিসে দক্ষ এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ ক্ষমতা তাকে দেশের ফুটবলে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। আক্রমণ গড়ে তোলার পাশাপাশি রক্ষণেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখত সে।’ ঘনিষ্ঠ বন্ধু জাহিদ হাসান এমিলির কণ্ঠে মিশে আছে আবেগ, ‘মামুনুলের বিদায়ে দেশের ফুটবল হারাবে অভিজ্ঞ এক মিডফিল্ড সেনানীকে, তার অবদান, অর্জন এবং নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’

৩৭ বছর বয়সী এই ফুটবলার বিদায়ের প্রান্তে এসে ফিরে তাকান দীর্ঘ পথের দিকে। সেখানে আছে ঘাম, আছে অশ্রু, আছে জয়-পরাজয়ের গল্প, আর সবচেয়ে বেশি আছে সমর্থকদের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকেই তিনি মনে করেন নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মাঠের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেও গল্প থেমে থাকে না। ইতিহাসে নাম লেখা হয়ে যায় অন্যভাবে। মামুনুল ইসলাম—বাংলাদেশ ফুটবলের এক অদম্য লড়াকু অধিনায়ক, এক নিখুঁত মিডফিল্ড শিল্পী—যার গল্প শেষ নয়, বরং রয়ে যাবে অনুপ্রেরণার আলো হয়ে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন