হরমুজে টোল আরোপের বিরোধিতা জাহাজ মালিকদের

হরমুজে টোল আরোপের বিরোধিতা জাহাজ মালিকদের
ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বের আটটি শীর্ষ জাহাজমালিক ও শিপিং সংগঠন।

তাদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের প্রতিষ্ঠিত নীতির পরিপন্থি হবে। একই সঙ্গে এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিজ্ঞাপন

ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে—এমন খবরের পর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গেজের কাছে একটি চিঠি পাঠায় সংগঠনগুলো।

সোমবার পাঠানো ওই চিঠি বুধবার প্রকাশ করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য বাধ্যতামূলক টোল বা সেবা ফি আরোপ আন্তর্জাতিক রীতিনীতির বড় ধরনের ব্যত্যয় হবে। এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ পরিচালনার স্বীকৃত আইনগত কাঠামোকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

সংগঠনগুলোর ভাষ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নৌচলাচলের অধিকার কোনো রাজনৈতিক দর-কষাকষির অংশ হওয়া উচিত নয়। হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ীভাবে টোল আদায়ের ব্যবস্থা চালু হলে জ্বালানির দাম বাড়বে, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবিকা ও জীবনযাত্রায় পড়বে।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলো হলো এশিয়ান শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল, ক্রুজ লাইনস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন, ইউরোপিয়ান শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ড্রাই কার্গো শিপওনার্স, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট ট্যাংকার ওনার্স এবং ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিল।

এর আগে আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গেজও বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে এবং বৈশ্বিক শিপিংয়ের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর নজির তৈরি করবে।

তার ভাষ্য, কোনো দেশেরই আন্তর্জাতিক প্রণালিতে টোল বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অধিকার নেই।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক হিনরিখ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্যনীতি প্রধান ডেবোরাহ এলমস বলেন, হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ী টোল ব্যবস্থা চালু হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এশিয়ায়। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশই এশিয়ার দেশগুলো আমদানি করে। এতে ডিজেল জ্বালানির দাম ও সংকট বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সার ও প্লাস্টিকের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত কিছু তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে সরানো সম্ভব হলেও প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে সেই বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে যদি অন্য আন্তর্জাতিক নৌপথেও একই ধরনের টোল আরোপ করা হয়, তবে কনটেইনার ও বাল্ক কার্গো পরিবহন আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালিতে কার্যত একটি সামুদ্রিক ‘টোল ব্যবস্থা’ চালু করে তেহরান। পরে মে মাসে ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ গঠনের মাধ্যমে সেই ফি আদায়ের ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়।

এদিকে অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতার কারণে হরমুজ প্রণালিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজে অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার বেশির ভাগের জন্য ইরানি বাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর এ অঞ্চলে ৬৪টি ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপরিবহন এখনো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

আইএমও এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ছয় হাজার নাবিক আটকে ছিলেন।

সবশেষ বুধবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় একটি তেলবাহী জাহাজ দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও)।

তবে সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্রু থম্পসনের মতে, জাতিসংঘ, আইএমও বা জাহাজমালিকদের সংগঠনগুলোর উদ্বেগ থাকলেও ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সমঝোতায় তাদের প্রভাব রাখার সক্ষমতা সীমিত।

তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার স্বার্থ থাকলেও ইরানের অবস্থান বদলাতে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর চাপ প্রয়োগের সুযোগ খুবই কম।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন