ইয়েমেনে রণক্ষেত্রে উত্তেজনার কেন্দ্রে তাইজ, শহরটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইয়েমেনে রণক্ষেত্রে উত্তেজনার কেন্দ্রে তাইজ, শহরটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ।

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজকে ঘিরে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর লড়াইয়ে শহরটি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র। কৌশলগত অবস্থানের কারণে তাইজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শহরটির দক্ষিণে এডেনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়কে হুথিদের অগ্রযাত্রায় তাইজ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানবিক সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সামরিক ও ভৌগোলিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ

প্রায় ছয় লাখ মানুষের আবাসস্থল তাইজ দীর্ঘদিন ধরে হুথিবিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ব্যাপক আকার ধারণ করার পর থেকেই শহরটি সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হুতিবিরোধী শক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান শহুরে অবস্থান হওয়ায় সামরিক দিক থেকে তাইজের গুরুত্ব অনেক।

শহরটির ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে এডেন এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে যাতায়াত ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব। এডেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। অন্যদিকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

তাইজের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে গেলে এডেনের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে সরকারপন্থী বাহিনীর সামরিক তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

এডেনের সড়ক বিচ্ছিন্ন করে হুথিদের অগ্রযাত্রা

তাইজের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা আগে থেকেই হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শহর এবং এর আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে সরকারপন্থী বাহিনী। তবে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে হুতিরা দক্ষিণ দিকে জাবাল সাবা পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অগ্রসর হয়ে এডেনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক বন্ধ করার চেষ্টা চালায়।

প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম পাহাড়ি সড়কটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে আল-তুরবাহ ও মুদিরিয়াত আল-মিসরাখ এলাকাও রয়েছে। ফলে অক্টোবরের শুরু থেকেই তাইজের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অবরোধ ভাঙতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তায় অভিযান চালাচ্ছে সরকারপন্থী বাহিনী। তাদের লক্ষ্য হারানো এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করে এডেনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তবে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

কেন হুথিবিরোধী প্রতিরোধের প্রধান ঘাঁটি শহরটি

তাইজের সঙ্গে উত্তর ইয়েমেনের শাসকদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই টানাপোড়েনপূর্ণ। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় শহরটি সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হন।

হুথিরা জাইদি শিয়া মতাবলম্বী হলেও তাইজের অধিকাংশ বাসিন্দা সুন্নি মুসলমান। তবে শহরটিতে হুথিবিরোধী মনোভাবের পেছনে শুধু ধর্মীয় পার্থক্য কাজ করেনি। রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং আরব বসন্তের পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রত্যাশাও এ বিরোধের সঙ্গে যুক্ত।

২০১৪ সালে সালেহ ও হুথিরা জোটবদ্ধ হয়ে রাজধানী সানা দখল করলে আরব বসন্ত-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হয়। পরের বছর তাইজে সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে হুথি ও সালেহপন্থী বাহিনী অভিযান শুরু করলে বিক্ষোভ ও সশস্ত্র সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর দীর্ঘ অবরোধের মধ্যে শহরটির বাসিন্দাদের গোলাবর্ষণ, স্নাইপারের হামলা এবং খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। ফলে তাইজের প্রতিরোধ কেবল সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধেরও প্রতিফলন।

অবরোধে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকট

তাইজকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে তাইজ প্রদেশে অন্তত ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ শহরের বাইরের গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।

এডেনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরে খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তাইজে গমের আটার মজুত প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে।

এর মধ্যে ইয়েমেনে আগে থেকেই অপুষ্টি ও বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ রয়েছে। কলেরা, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও ব্যাপক। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক জরিপে পরীক্ষা করা শিশুদের প্রতি তিনজনের একজনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

সামনে কী হতে পারে

তাইজের অবরোধ ভাঙতে সরকারপন্থী বাহিনী অভিযান চালালেও তাদের সাফল্য এখনও অনিশ্চিত। অন্যদিকে হুতিরা শহরটির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করে ভেতরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ কিংবা সরাসরি শহর দখলের অভিযান—দুই ধরনের পরিস্থিতিই তৈরি হতে পারে।

তবে তাইজে স্থানীয় প্রতিরোধ শক্তিশালী হওয়ায় সরাসরি দখল অভিযান সহজ হবে না। এমন অভিযান শুরু হলে তা দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন