আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত সপ্তম বিশ্ব আন্তসাংস্কৃতিক সংলাপ ফোরামে অংশ নিয়েছে মুসলিম কাউন্সিল অব এল্ডার্স। ২৭ ও ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ ফোরামের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য সংলাপ: বিভক্ত বিশ্বে সেতুবন্ধ তৈরি’। ফোরামে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
‘ধর্মগুলোর মধ্যে সংলাপ: অভিন্ন ভবিষ্যতের রূপরেখা’ শীর্ষক এক অধিবেশনে মুসলিম কাউন্সিল অব এল্ডার্সের মহাসচিবের উপদেষ্টা বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল সালাম বলেন, বিশ্বের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব নয়; বরং প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সঙ্গে এই বৈচিত্র্য সামাল দিতে না পারা।
তিনি বলেন, ভিন্নতা যেন সংঘাত ও বিভেদের অজুহাত না হয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও একে অপরের পরিপূরক হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। তার মতে, সংলাপ কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়; এর জন্য সহাবস্থানের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার ভবিষ্যৎ গড়তে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আবদুল সালাম ২০১৯ সালে আবুধাবিতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘মানব ভ্রাতৃত্বের দলিল’-এর কথা উল্লেখ করেন। আল-আজহারের গ্র্যান্ড ইমাম ও মুসলিম কাউন্সিল অব এল্ডার্সের চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল-তাইয়েব এবং প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস যৌথভাবে ওই দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন।
তিনি বলেন, দলিলটিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষার নৈতিক শক্তি। এটি ঘৃণা বা কাউকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার যুক্তি হতে পারে না।
আবদুল সালাম আরো বলেন, উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্বেষ ছড়ানোর পক্ষে ধর্মকে ব্যবহার করা ধর্মগুলোর প্রকৃত বার্তাকে বিকৃত করার শামিল। অথচ ধর্মের মূল শিক্ষা হলো মানুষের মধ্যে দয়া, সহমর্মিতা ও শান্তি ছড়িয়ে দেওয়া।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব শুধু বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সহাবস্থানের কথা বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উগ্রবাদী মতাদর্শের মোকাবিলা, বিভেদ ও সংঘাত উসকে দিতে ধর্মের অপব্যবহার ঠেকানো এবং তরুণদের উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতার প্রভাব থেকে রক্ষা করাও তাদের দায়িত্বের অংশ।
আবদুল সালাম এমন একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যার মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা, উগ্রবাদ-সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলা এবং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, এসব উদ্যোগ মানব ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ার সূচনা হয় এই উপলব্ধি থেকে যে মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তা অভিন্ন মানবিক পরিচয়কে মুছে দিতে পারে না। মানুষকে বিভক্ত করে এমন ধারণার তুলনায় তাদের ঐক্যবদ্ধ করে এমন মূল্যবোধ অনেক বেশি গভীর।
ফোরামে মুসলিম কাউন্সিল অব এল্ডার্সের সদস্য এবং আজারবাইজান ও ককেশাস অঞ্চলের মুসলিমদের ধর্মীয় নেতা শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদেহও উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসারীদের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি সহনশীলতা, সহাবস্থান ও মানব ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধ বিকাশ এবং উগ্রবাদ ও বিদ্বেষ মোকাবিলায় ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। তার মতে, এসব উদ্যোগ সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: এমিরেটস নিউজ এজেন্সি (ডব্লিউএএম)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


