বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে মক্কা চুক্তি

বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে মক্কা চুক্তি

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও সংশয় বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় তিন দেশের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। এর মূল লক্ষ্য, কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করা।

চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো: তিন দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাব ও নির্ভরতার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিচসেনের মতে, প্রায় এক দশক ধরেই আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন অংশীদারিত্ব কতটা নির্ভরযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং সংঘাত নিরসনে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা সেই উদ্বেগকে আরো বাড়িয়েছে।

তবে উলরিচসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মক্কা চুক্তির উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটানো নয়। বরং ওয়াশিংটনের সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্প তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তোসিও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ যে বদলাচ্ছে, মক্কা চুক্তি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও রিয়াদ এখন শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পথ বেছে নিচ্ছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রভাব যথেষ্ট বিবেচনায় না নিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মার্কিন মিত্র রাষ্ট্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। এর পর ইরানি বাহিনী অঞ্চলটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। জ্বালানি ও তেল পরিশোধন স্থাপনাসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোও এসব হামলার আওতায় আসে।

পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায়। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। একই সময়ে মিত্র দেশগুলোকে পর্যাপ্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করতেও ওয়াশিংটনকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়ে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক মনে করেন, মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

কারণ চুক্তিতে থাকা তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে যে মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমপর্যায়ের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে চুক্তিটিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান উত্তেজনা কমানো এবং মধ্যস্থতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বরং তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমন্বয় এবং সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রকে একেবারে বাদ দেওয়ার বদলে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরো বহুমুখী অংশীদারিত্ব ও ‘নর্মেটিভ ডিটারেন্স’ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে মক্কার এই চুক্তি সেই পরিবর্তনশীল বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

সূত্র: আল জাজিরা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন