হরমুজে ইরানের দাপট, সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

হরমুজে ইরানের দাপট, সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে ইরানের নতুন অস্ত্র হরমুজ প্রণালি। ইরান এটি সহজে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়।

তেহরান দেখিয়ে দিয়েছে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের চোকপয়েন্ট বা নৌপথটি কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করতে সক্ষম।

বিজ্ঞাপন

সিএনবিসি-র সাথে আলাপকালে একাধিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসের সাথে ইরান শেষ পর্যন্ত যে চুক্তিতেই পৌঁছাক না কেন, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের এই প্রভাব চলমান সংঘাতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পারস্পরিক হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের বিষয়টি ইঙ্গিত করে তাদের মধ্যকার কোনো চুক্তি হওয়া এখনও অনেক দূরের বিষয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি হলেও তা ইরানকে তাদের এই নতুন আবিষ্কৃত জ্বালানি অস্ত্রের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এর বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে, যা ইতোমধ্যে একটি ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় বিপর্যস্ত। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই সমুদ্রপথের মাধ্যমেই পরিবাহিত হতো।

এই প্রণালি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা হয়তো জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নত করবে, তবে তার জন্য বড় মূল্য দিতে হবে। জ্বালানির বাইরেও এই প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা অন্যান্য পণ্য যেমন-সার, জেট ফুয়েল, হিলিয়াম এবং অ্যালুমিনিয়ামের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

রাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ‘ইরান যা প্রমাণ করেছে তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের তীব্র বোমাবর্ষণের মুখেও এই প্রণালি বন্ধ করার এবং তা বন্ধ রাখার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। আর এটি এমন এক ক্ষমতা যা কেউ কখনো তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটি তাদের নতুন পারমাণবিক বিকল্প।’

হরমুজ টোল বা ট্রানজিট ফি?

বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকার চেয়ে ইরানের (ওমানের সাথে যৌথভাবে) আংশিক নিয়ন্ত্রণে এটি খোলা থাকলে তা বিশ্ব অর্থনীতির কম ক্ষতি করবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’ গত এপ্রিলে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক শিক্ষাবিদরাও একই ধরনের যুক্তি দিয়েছেন। অন্য কথায়, বিষয়টি যতই আশঙ্কাজনক হোক না কেন, এটি এখন মূলধারার আলোচনায় প্রবেশ করেছে।

ইরান অবশ্য মার্কিন দাবির সরাসরি বিরোধিতা করে এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে পদক্ষেপ নিয়েছে। গত মাসে তারা ট্রানজিটের নতুন প্রোটোকল তদারকি করতে ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) গঠন করেছে, যার মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জাহাজের তথ্য যাচাই এবং কিছু ক্ষেত্রে ফি বা টোল আদায়ের নিয়ম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পিজিএসএ-র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং শিপিং কোম্পানিগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তেহরানের সাথে চুক্তি বা লেনদেন করা নিষিদ্ধ করেছে। হোয়াইট হাউস সেইসব কোম্পানির বিরুদ্ধেও সেকেন্ডারি বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে যারা ইরানকে এই ফি বা টোল প্রদান করবে।

তা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখার মরিয়া চেষ্টায় কিছু তেল ব্যবসায়ী এবং শিপিং কোম্পানি ইরানের সাথে গোপনে ব্যবস্থা বা রফা করেছে বলে জানা গেছে, যেখানে বিশ্ব বাজারে তেলের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি-র রিফাইনিং, কেমিক্যালস এবং অয়েল মার্কেটস বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালান গেল্ডার বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেলের প্রবাহ পুনরায় শুরু হওয়া। এটি জ্বালানি সংকটের অবসান ঘটাতে শুরু করবে।’

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি যদি বছরের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে ২০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে, যা এই জ্বালানি সংকটকে ‘একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে’ রূপান্তর করবে বলে যোগ করেছেন উড ম্যাকেঞ্জির অর্থনীতি বিভাগের প্রধান পিটার মার্টিন।

তেলের দামে প্রতিফলিত হবে বর্ধিত ঝুঁকি

গেল্ডারের মতে, যদি টোল আদায়ের মাধ্যমে ট্যাংকার যাতায়াত যুদ্ধপূর্ববর্তী স্তরে অর্থাৎ দিনে প্রায় ১৪০টি জাহাজে ফিরে আসে, তবে তা তেলের দামের ক্ষেত্রে অন্তত অনেক কম ব্যয়বহুল হবে।

শিপিং ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘লয়েডস লিস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, তেহরান অন্তত একটি জাহাজের কাছ থেকে প্রতি ট্যাংকারে ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি চার্জ করেছে। গেল্ডার হিসাব করে দেখিয়েছেন, এই পরিমাণ ফি প্রতি ব্যারেল তেলের দামে মাত্র ১ ডলারের মতো যোগ করবে।

তবে গেল্ডার সতর্ক করে দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তেহরান কীভাবে প্রতিদিন ১৪০টি ট্যাংকার যাতায়াতের লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই উদ্বেগের বিষয় হলো তা তেলের প্রবাহকে কতটা সীমিত বা বাধাগ্রস্ত করছে।’

এদিকে জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘রাইস্ট্যাড’ মনে করে, তেলের দামে ১ থেকে ২ ডলারের প্রিমিয়াম বা বাড়তি মূল্য যোগ হওয়া খুবই রক্ষণশীল হিসাব।

রাইস্ট্যাডের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোর্হে লিওন বলেন, ‘আমরা প্রতি ব্যারেলে ১০ থেকে ২০ ডলারের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়ামের কথা বলছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত, ইরান ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ওপর কোনো না কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, আর তা হলে প্রণালিতে আরো বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি বাস্তব রূপ নেবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বছরের শুরুতে থাকা প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলারের তেলের দামে আর ফিরে যাচ্ছি না, এমনকি ২০২৭ সালেও নয়।’

প্রণালির বিকল্প পথ

ইরান এই প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিক বা না দিক, এই সমুদ্রপথের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে। এই ধরনের উদ্বেগ ইতোমধ্যেই পারস্য উপসাগরের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে বিকল্প রপ্তানি রুট ব্যবহার এবং বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) যথাক্রমে তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ এবং ‘হাবশান-ফুুজাইরাহ’ পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি ডাইভার্ট বা পুনর্নির্দেশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই প্রণালি এড়াতে ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় একটি পাইপলাইনের কাজ শুরু করেছে।

কিন্তু অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য এই প্রণালির বিকল্প পথগুলো রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে কম টেকসই। উদাহরণস্বরূপ, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইনকে তাদের রপ্তানি পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠাতে হলে সৌদি আরব বা ইরাকের ওপর দিয়ে পাঠাতে হবে।

উড ম্যাকেঞ্জির গেল্ডার বলেন, পাইপলাইন তৈরি করার অর্থ হলো ‘বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্প, যা প্রায়শই আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে হয়, যার মানে এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জটিল এবং দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।’

কাতারের জন্য, যারা বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রপ্তানি করে, হরমুজের বিকল্প তৈরি করতে কেবল ব্যয়বহুল পাইপলাইন অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, বরং পাইপলাইনের গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে বিশ্বব্যাপী জাহাজে পাঠানোর জন্য বন্দরে লিকুইফেকশন বা তরলীকরণ সুবিধাতেও বিনিয়োগ করতে হবে।

তবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যেমনটি দেখায়, নতুন জ্বালানি অবকাঠামোও ইরানি আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে না। ইউরেশিয়া গ্রুপের ব্রিউ বলেন, এই পাইপলাইনগুলোও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সীমার মধ্যেই থাকবে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় বিশেষ নজর

রাশিয়ার ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণের ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের পরপরই হরমুজ প্রণালিতে এই যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বিঘ্ন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর মনোযোগ আরো তীব্র করেছে।

পারস্য উপসাগর থেকে দূরে লাতিন আমেরিকার মতো অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে এবং বিদ্যুতায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ চেইন বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

তা সত্ত্বেও, বিশ্বের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য আরো কিছু সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা অপরিহার্য থাকবে, যা ইরানের এই নতুন জ্বালানি অস্ত্রকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।

ব্রিউ বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিকে শেষ পর্যন্ত এই বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হবে। এটি এক বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এটি ইঙ্গিত করে শেষ পর্যন্ত হরমুজ এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা বহুলাংশে ইরানের পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।’

সূত্র: সিএনএন

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...