বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় শক্তি হরমুজ প্রণালি

বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় শক্তি হরমুজ প্রণালি

ইরান যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই সরু জলপথ। যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।

পারস্য উপসাগরে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় প্রযুক্তি ও বৈশ্বিকায়নের পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। যুদ্ধের মধ্যেও সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের পর্যায়ের তুলনায় বেড়েছিল। ওই মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি গড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ৮৩ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। মাসের ১৪ দিন এই রপ্তানি যুদ্ধের আগের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

এর পেছনে সৌদি আরবের রপ্তানি বৃদ্ধি বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার করেও কয়েকটি দেশ জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। ফলে যুদ্ধ সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

তবে পরিস্থিতি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনাও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় জাহাজ মালিক ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের জন্য পরিবহন ব্যয় এবং ঝুঁকি উভয়ই বাড়ছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

এ কারণে যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি পৌঁছানোর পথ নিরাপদ থাকবে কি না—তার ওপরও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। এর আগে নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মে মাস থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালির দক্ষিণাংশ দিয়ে ট্যাংকার চলাচলে সহায়তা করছে। এতে যুদ্ধের সময়ও বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

তবে একই সময়ে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতি বড় চাপের মধ্যে পড়েছে। তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়া, মুদ্রার দরপতন এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ৫ অক্টোবর ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ পদত্যাগ করেন। একই দিনে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দরও রেকর্ড পর্যায়ে নেমে যায়।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে ইরান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও হরমুজ ও সংশ্লিষ্ট সমুদ্রপথে সামরিক ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ফলে সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরো বাড়তে পারে।

ইরান যুদ্ধের এই অভিজ্ঞতা মূলত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বিশ্ব অর্থনীতি যতই ডিজিটাল, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিক হয়ে উঠুক, গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা এখনো কমেনি। একটি সংকীর্ণ জলপথে সংঘাত বা অবরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব তেল, পরিবহন, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

অর্থাৎ বৈশ্বিকায়ন ভূগোলের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়নি; বরং গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানগুলোকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তি, বৈশ্বিকায়ন ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার প্রভাব যতই বাড়ুক, ইরান যুদ্ধ আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—ভূগোল এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় শক্তি। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও জ্বালানি পরিবহনপথে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন