কানাডা, মেক্সিকোর মতো চীনের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৪ মার্চ থেকে আমেরিকায় প্রবেশকারী চীনা পণ্যের জন্য জারি হয়েছে ১০ শতাংশ শুল্ক। বসে নেই বেইজিংও। পাল্টা জবাব হিসেবে আমেরিকার কৃষিপণ্যের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে চীনারা। যা কার্যকর হবে আগামী ১০ মার্চ থেকে। একই সঙ্গে ১৫টি আমেরিকার কোম্পানির ওপর রপ্তানি সীমিত করবে তারা। ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ করার পরও আমেরিকাকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি বলেছেন, আমেরিকার সঙ্গে যে কোনো ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বেইজিং। বিশ্বের এই দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ক্রমেই বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার অফিশিয়াল সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ চীনা দূতাবাস লিখেছে, আমেরিকা যদি যুদ্ধ চায়, সেটা শুল্ক, বাণিজ্য বা অন্য কোনো যুদ্ধ—চীন শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে কঠোর বার্তা। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে যখন বিশ্বনেতারা একত্র হয়েছেন, তখন এই হুঁশিয়ারি দিল বেইজিং।
বুধবার, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি শিয়াং ঘোষণা করেছেন, চীন এই বছর আবারও তার প্রতিরক্ষা ব্যয় ৭ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি করবে। তিনি সতর্ক করেন, বিশ্বজুড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেসব পরিবর্তন হয়নি তাই এখন দ্রুত ঘটছে।
তবে বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকির মধ্যেও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে নিজ দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন বেইজিংয়ের নেতারা।
চীন আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল দেশ, এমনটাই বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চায়। যেখানে তারা আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য দায়ী করছে।
এদিকে, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে চীন। তারা এসব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। বুধবার চীনা প্রধানমন্ত্রী লি শিয়াং বলেছেন, চীন মুক্ত বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে এবং দেশটিতে আরো বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আশা করবে।
যুদ্ধে যাওয়ার জন্য চীন প্রস্তুত, এমনটা আগেও জোর বলে বলেছে বেইজিং। গত অক্টোবরে, প্রেসিডেন্ট শি তাইওয়ানের স্বশাসিত দ্বীপের চারপাশে সামরিক মহড়া করার সময় যুদ্ধের জন্য তাদের প্রস্তুতি জোরদার করতে নিজ দেশের সেনাবাহিনীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সামরিক প্রস্তুতি এবং যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকাকে দোষারোপ করে বলেছে, তারা চীনের ওপর অন্যায্যভাবে চাপ সৃষ্টি করছে এবং মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। বিশেষ করে ফেন্টানাইল মাদকের বিষয়ে। এটি একটি তুচ্ছ অজুহাত।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকার হুমকিতে ভয় পায় না চীন। তাদের তর্জন গর্জন কোনো কাজে আসবে না। চাপ, বলপ্রয়োগ বা হুমকি দিয়ে চীনকে মোকাবিলা করা যাবে না। আমেরিকা-চীন সম্পর্ক বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। বেইজিং ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক হুমকি। আর এটি এক্স-ও ফলাও করে শেয়ার করা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে জিনপিংয়ের আমন্ত্রণ দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাবে বলে আশা করেছিলেন বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা।
জিনপিং এরই মধ্যে নিজ দেশের বেকারত্ব, আবাসন সংকট ও ভোক্ত ব্যয় কমানোর মতো সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। চীন তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের অধিবেশনেও এই পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে, চীনা যুদ্ধজাহাজ তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে প্রদক্ষিণ করছে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে। সিডনির ২০০ মাইলের মধ্যে এসব জাহাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, নিউজিল্যান্ডের দোরগোড়ায় সামরিক মহড়াও চালাচ্ছে তারা। আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা ছাড়াই এই মহড়া উভয় দেশের মধ্যে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। চীনের এই সামরিক শক্তির আভাস দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান প্রণালির দূরবর্তী জলসীমায় আবদ্ধ থাকেনি। তাদের যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানের কাছেও দেখা গেছে। এটি বেইজিং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনা নৌ শক্তি প্রদর্শনের অংশ, যা আমেরিকা ও তার মিত্রদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। তবে চীন তার কাজের জন্য একেবারেই অনুতপ্ত নয়। বরং জোর দিয়ে জানিয়েছে, তারা কোনো আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেনি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যে পরামর্শমূলক বার্তাও দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পশ্চিমের চীনের এমন মহড়ার সঙ্গে পরিচিত ও অভ্যস্ত হওয়া উচিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

