শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলছে গাজা-ইসরাইল সংঘাত। বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ এই সংঘাতকে দেখছেন ধর্ম এবং নিজস্ব ভূখণ্ডের লড়াই হিসেবে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকা একে দেখছে একেবারেই ভিন্ন চোখে। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা বছরের পর বছর ধরে গাজা ভূখণ্ডকে দেখছেন ‘রিয়েল এস্টেট’ ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প তার এই দৃষ্টিভঙ্গিকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। গাজার পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তিনি একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা’।
গত শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজা ভূখণ্ডের মালিকানা গ্রহণের জন্য তার পরিকল্পনাকে একটি রিয়েল এস্টেট লেনদেন হিসেবে দেখা উচিত। তবে এজন্য কোনো সময়সূচি উল্লেখ করেননি তিনি। কারণ এজন্য তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সেখানে তিনি গাজা দখলের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। পরে ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেছিলেন, ইসরাইলের উচিত হামাসের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গাজা ভূখণ্ডকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করা। তিনি বলেন, তার পরিকল্পনার অধীনে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি এরই মধ্যে সুন্দর ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য পুনর্বাসিত হয়ে যেত।
যদিও ধারণাটি বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবুও এটি ট্রাম্পের পূর্ববর্তী দখলদারিত্বের প্রতি আবেগের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী ভবন, রিসোর্ট ও গল্ফ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাম্প এবার গাজা নিয়ে ভিন্ন কিছু চিন্তা করছেন। এই অঞ্চল নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে স্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাতকে বন্ধের জন্য এটিকে নির্মাণ চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছেন।
মূলত ট্রাম্পের এমন ধারণার শুরু তার জামাতা ও সাবেক সিনিয়র উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের একটি মন্তব্যের জের ধরে। আরব-ইসরাইলি সংঘাতকে তিনি একবার ‘একটি রিয়েল এস্টেট বিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই সঙ্গে গাজা উপত্যকার ভূমধ্যসাগরীয় জলপ্রান্তের সৌন্দর্য নিয়েও কথা বলেছিলেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন সফরের সময় নেতানিয়াহু একটি ভিডিও বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার প্রশংসা করেন। তবে বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের আলোড়ন তোলে তার এই পরিকল্পনা, একই সঙ্গে ওঠে নিন্দার ঝড়ও। আরব দেশ ছাড়াও মিত্র দেশও ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটকে ‘ভূমি কেনাবেচার’ চুক্তিতে পরিণত করার অভিযোগ করেছেন। কারণ তাদের অনেকেই ইসরাইলের পাশাপাশি গাজাকেও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আগ্রহী। তবে ট্রাম্পের সহযোগীদের মতে, দীর্ঘ ১৫ মাস গাজায় ভয়াবহ হামলা চালায় ইসরাইল। এতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গাজার উত্তরাঞ্চল। তাই বাসিন্দারা অন্যত্র সরে গেলে উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পাবে। তবে ট্রাম্পের গাজা দখলের পরিকল্পনার কথা জানতেন না তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে পররাষ্ট্র দপ্তর বা পেন্টাগনের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো বৈঠক করেননি ট্রাম্প। সাধারণত যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের আলোচনা হয়। কিন্তু এবার তার কিছুই হয়নি। গাজা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে কোনো কিছুই হয়নি বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
এদিকে শুক্রবার জর্ডানের আম্মানে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে একটি বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম ব্রাদারহুড ও অন্যান্য বিরোধী দল আয়োজিত এই বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাম্পের নিন্দা জানিয়ে পোস্টার ও ব্যানার নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়।
তবে অন্যরা এটিকে নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের পক্ষ থেকে একটি কূটনৈতিক উপহার হিসেবে দেখছে। গাজা নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বিভিন্ন পরিকল্পনার পর গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে দক্ষিণ কমান্ডের তিনটি ডিভিশন থেকে বাহিনী মোতায়েন করেছে আইডিএফ। এই অঞ্চলের সীমান্তবর্তী ইসরাইলি নাগরিকদের প্রতিরক্ষা স্তর শক্তিশালী করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে তারা।
শুক্রবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরাইল গাজার নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে তুলে দেবে, তারপর গাজা পুনর্নির্মাণ করা হবে। তবে এর জন্য কত ব্যয় হবে এবং তা কোথা থেকে জোগাড় করা হবে, তার বিস্তারিত কিছুই জানাননি ট্রাম্প।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

