নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে হত্যাকারী সেনার দণ্ড মওকুফ করলেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট

নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে হত্যাকারী সেনার দণ্ড মওকুফ করলেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট

আহত ও নিরস্ত্র এক ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দণ্ডিত ইসরাইলি সেনা এলোর আজারিয়াকে ক্ষমা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। ২০১৬ সালে অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে ওই ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ২০১৭ সালে আজারিয়াকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ইসরাইলের সামরিক আদালত। ঘটনাটি তখন ইসরাইল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

২০১৬ সালের মার্চে হেবরনে আবদেল ফাত্তাহ আল-শরিফ নামে ওই ফিলিস্তিনি একজন ইসরাইলি সেনাকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন। পরে ইসরাইলি সেনারা তাকে গুলি করে মাটিতে ফেলে দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মাটিতে পড়ে ছিলেন। ওই সময় আজারিয়া সেখানে পৌঁছে তার মাথায় গুলি করেন। মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর আজারিয়াকে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ২০১৭ সালে তাকে হত্যার দায়ে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে সাজা কমিয়ে ১৪ মাস করা হয় এবং প্রায় ৯ মাস কারাভোগের পর ২০১৮ সালের মে মাসে তিনি মুক্তি পান।

আজারিয়ার সাজা ছিল ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্যের মাঠপর্যায়ের প্রাণঘাতী কর্মকাণ্ডের জন্য দণ্ডিত হওয়ার বিরল ঘটনা। সে সময় দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা তার বিচারের পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে ইসরাইলের অনেক মানুষ আজারিয়ার সমর্থনে অবস্থান নেন। তার বিচারকে কেন্দ্র করে দেশটিতে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

শনিবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আজারিয়াকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের সুপারিশ, ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়া, আজারিয়ার সাজা সম্পন্ন হওয়া এবং তার অনুশোচনার বিষয় বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আসন্ন ইহুদি ধর্মীয় উৎসব ইয়ম কিপুরের (প্রায়শ্চিত্তের দিন) কথাও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, এই ক্ষমা মূল মামলার রায় বা বিচারপ্রক্রিয়াকে পুনর্মূল্যায়ন করছে না। বরং আজারিয়াকে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

তবে ক্ষমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরাইলের ভেতরেও ভিন্নমত রয়েছে। দেশটির সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির ক্ষমা না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সামরিক নেতৃত্বের আপত্তি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ক্ষমার সিদ্ধান্ত দেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আজারিয়াকে ‘জটিল সামরিক অভিযানে’ থাকা একজন সেনা হিসেবে উল্লেখ করেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই আজারিয়ার সাজাকে যথেষ্ট কঠোর নয় বলে সমালোচনা করে আসছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও ২০১৭ সালে সাজাটিকে ‘অতিরিক্ত লঘু’ বলে মন্তব্য করেছিল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ওই হত্যাকাণ্ডকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

আজারিয়ার মামলাটি ইসরাইলের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছিল। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালোন তার বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক চাপ ও মামলাটি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেন। রায়ের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও আজারিয়াকে ক্ষমা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ক্ষমা পাওয়ার পর আজারিয়া আগের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একই পরিস্থিতিতে পড়লে তিনি একইভাবে কাজ করতেন। তার এই বক্তব্যও ঘটনাটিকে ঘিরে বিতর্ককে আরো তীব্র করেছিল।

প্রায় এক দশক পর প্রেসিডেন্টের ক্ষমার মধ্য দিয়ে আজারিয়ার মামলার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। তবে ঘটনাটি নিয়ে ইসরাইলি সমাজ, ফিলিস্তিনি পক্ষ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভিন্ন অবস্থান এখনো রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তরও স্পষ্ট করেছে, ক্ষমার সিদ্ধান্তটি মূল মামলার বিচারিক রায়কে পুনর্বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নয়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও আল-জাজিরা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন