বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কারে আফ্রিকার নারীদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অবৈতনিক শ্রমকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্যান-আফ্রিকান মানবাধিকার কর্মী ক্রিস্টাল সিমিওনি। তার মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ধারণের সময় শুধু সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করলে চলবে না; এর ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও পরিচর্যা খাতে কী প্রভাব পড়ছে এবং নারীদের ওপর কতটা অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে, তাও মূল্যায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি আফ্রিকার দেশগুলোর ঋণসংকট মোকাবিলায় নতুন নীতির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন তিনি।
ঋণের চাপে কমছে সামাজিক খাতে ব্যয়ের সুযোগ
আফ্রিকার দেশগুলোতে মাথাপিছু গড় সুদ পরিশোধের ব্যয় ৭০ ডলার। বিপরীতে শিক্ষা খাতে মাথাপিছু ব্যয় ৬০ ডলার এবং স্বাস্থ্য খাতে ৩৯ ডলার। ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে সরকার যখন ব্যয় সংকোচনের পথে যায়, তখন জনসেবা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নারী ও মেয়েদের ওপর, কারণ পরিবারের পরিচর্যা, অসুস্থ সদস্যদের সেবা এবং ঘরোয়া কাজের বাড়তি দায়িত্ব প্রায়ই তাদেরই নিতে হয়।
কেনিয়ায় নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে ৩ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট বেশি অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন। অর্থাৎ, অর্থনীতির কার্যক্রম সচল রাখতে নারীদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জাতীয় আয়-ব্যয়ের প্রচলিত হিসাবের বড় অংশে এই শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না।
এখানে অবৈতনিক শ্রম বলতে রান্না, শিশু ও বয়স্কদের পরিচর্যা, পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের সেবা এবং অন্যান্য গৃহস্থালি কাজকে বোঝানো হয়েছে; যেগুলোর জন্য সাধারণত কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। এসব কাজের অর্থনৈতিক মূল্য হিসাবের বাইরে থাকলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীদের অবদানও আড়ালে থেকে যায়।
কর ফাঁকি ও পুঁজি পাচার মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
আফ্রিকা থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বেরিয়ে যাওয়াকে আরেকটি বড় সমস্যা। মহাদেশটি থেকে বছরে আনুমানিক ৮৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পুঁজি বাইরে চলে যায়; এর পেছনে কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতাবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন নিয়ে চলমান আলোচনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানি কোথায় নিবন্ধিত বা তাদের সদর দপ্তর কোথায় অবস্থিত, শুধু সেটির ভিত্তিতে কর নির্ধারণ না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেখানে সংঘটিত হয়, সেখানে মুনাফার যথাযথ কর আরোপের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে আফ্রিকার দেশগুলোর রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই অর্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পানি সরবরাহ এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক সেবায় ব্যয় করা সম্ভব হবে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সমঝোতা, কর প্রশাসনের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি বাস্তবায়নের ওপর।
অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন জরুরি
নারীদের অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝাতে কেনিয়ার পরিসংখ্যান দেখাই যথেষ্ট। ২০২১ সালে দেশটিতে মোট ৩০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘণ্টার অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজের মধ্যে নারীদের অংশ ছিল ২৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘণ্টা। কেনিয়ার জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, এই কাজের আর্থিক মূল্য দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান।
এই তথ্যের ভিত্তিতে কেনিয়া জাতীয় ও কাউন্টি পর্যায়ের বাজেটে পরিচর্যাসংক্রান্ত পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে একটি জাতীয় পরিচর্যা নীতি প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নিয়মিত অর্থনৈতিক মূল্যায়নেও এ ধরনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে পরিবারের অবৈতনিক শ্রমের পরিমাণ ও অর্থনৈতিক মূল্য দৃশ্যমান হবে এবং ঋণ পরিশোধের নীতির সঙ্গে সামাজিক ব্যয়ের সম্পর্ক আরো স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
২০২৫ সালে মরিশাসে শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনে। সিমিওনি এটিকে পারিবারিক ব্যয়ের চাপ কমাতে আর্থিক নীতি ব্যবহারের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ঋণ পুনর্গঠনে স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা খাতে ব্যয় সুরক্ষার প্রস্তাব
আফ্রিকার ঋণসংকট মোকাবিলায় আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রস্তাবিত অভিন্ন অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গৃহীত ওই অবস্থানে সার্বভৌম ঋণ বিষয়ে জাতিসংঘের একটি বাধ্যতামূলক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ঋণগ্রহীতাদের অংশগ্রহণমূলক এবং শুধু ঋণদাতাদের স্বার্থনির্ভরতা থেকে মুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নতুন ঋণগ্রহীতা প্ল্যাটফর্মের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনকে সামনে রেখে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আলোচনায় সমন্বিত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পাবে।
তবে প্ল্যাটফর্মটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কোনো সংস্থা নয়; এটি মূলত সমন্বয় ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থা। ফলে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় তাদের অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তার ওপর।
দুটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব
সিমিওনি দুটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব করেছেন। প্রথমত, আইএমএফের ঋণ টেকসইতা মূল্যায়ন কাঠামোয় এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ঋণ পরিশোধের জন্য কত অর্থ প্রয়োজন, তার পাশাপাশি সামাজিক সেবা ও পরিচর্যা খাতে এর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, ঋণ পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত আইএমএফের প্রতিটি কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য, পানি ও পরিচর্যা অবকাঠামোর জন্য ন্যূনতম বাধ্যতামূলক ব্যয়সীমা রাখতে হবে। শুধু সাধারণ সামাজিক ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; এসব খাতে ব্যয় নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কেনিয়ার রাজস্ব পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন, দেশটির জাতীয় কোষাগারের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছরে কর রাজস্বের ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ ও পেনশন পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। এতে নারীদের অবৈতনিক শ্রমের চাপ কমাতে সহায়ক সামাজিক কর্মসূচির জন্য সরকারের হাতে সীমিত অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
বৈশ্বিক আর্থিক সংস্কারে আফ্রিকার নিজস্ব অবস্থান
আফ্রিকার অর্থনৈতিক সমস্যাকে শুধু ঋণের পরিমাণ বা বিনিয়োগের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বরং ঋণনীতি, করব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় এবং নারীদের অবৈতনিক শ্রমের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আফ্রিকার দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে স্থানীয় বাস্তবতা এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা হওয়া উচিত দেশগুলোর উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে সহায়তা করা, এমন শর্ত আরোপ করা নয়, যা জনসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামাজিক ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নিশ্চিত করা বাস্তব নীতিনির্ধারণে জটিল চ্যালেঞ্জ। এ কারণে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সমঝোতা, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এবং জবাবদিহিমূলক বাজেট ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সাফল্য শুধু ঋণ পরিশোধ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি কিংবা বাজারে প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে পরিমাপ করা উচিত নয়। সেই ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, জনসেবা এবং নারীদের শ্রমের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। আফ্রিকার নারীদের অর্থনৈতিক অবদানকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে পারলেই আর্থিক সংস্কার আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

