ইরানের ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ইউরোপের কয়েকটি বিমানঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কোথাও সরাসরি হামলার জন্য মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। কোথাও ব্যবহার করা হয়েছে পরিবহন, আকাশে জ্বালানি সরবরাহ, মেরামত ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য। আবার কোনো কোনো দেশ তাদের ভূখণ্ড ও ঘাঁটি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।

ব্রিটিশ ঘাঁটি ফেয়ারফোর্ডকে ঘিরে কয়েক দিন আগের একটি নিরাপত্তা ঘটনা ইউরোপীয় বিমানঘাঁটিগুলোর ভূমিকা আবার সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের ওপর হামলার জন্য মার্কিন বোমারু বিমানগুলোকে এই ঘাঁটিতে রাখা হয়েছিল।
ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তারা একজন ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে ইরানের জড়িত থাকার ‘জোরালো প্রমাণ’ রয়েছে। তবে ইরান কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহজনক যানবাহনের খবর পাওয়ার পর ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সি পাঁচজন ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধ এবং ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি’ নেওয়ার সন্দেহে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এক দিন পর তাদের সবাইকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, যানবাহনগুলোতে কিছু পেট্রল পাওয়া গেলেও কোনো বিস্ফোরক ডিভাইস পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারের আগে তাদের একজন পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করেছিলেন বলেও জানা গেছে।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির গুরুত্ব আরো বেশি। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি মার্কিন অভিযানের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়েছে। জুলাইয়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি বিশেষভাবে ফেয়ারফোর্ডের নাম উল্লেখ করে সতর্ক করেছিল। তারা বলেছিল, ইরানে বোমা হামলার জন্য ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলো ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে।

তবে ইরান যুদ্ধে ইউরোপীয় বিমানঘাঁটিগুলোর ভূমিকা একরকম ছিল না। পর্তুগালের লাজেস, জার্মানির রামস্টাইন এবং গ্রিসের সুদার মতো কিছু ঘাঁটি মূলত মার্কিন সহায়তা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। এসব ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান পরিবহন, আকাশে জ্বালানি সরবরাহ, মেরামত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সহায়তা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালির মতো কয়েকটি দেশ যুদ্ধ-সংক্রান্ত কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ও ঘাঁটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা ও মতবিরোধ তৈরি হয়।
পোল্যান্ডভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের হিসাবে, ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরিত সামরিক সম্পদের পরিমাণ ওই অঞ্চলে থাকা মোট মার্কিন বাহিনীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তবে মার্কিন বাহিনীর মূল অংশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপ মার্কিন অভিযানের জন্য আকাশপথে সহায়তা ও জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান কেন্দ্রেও পরিণত হয়।
ব্রিটেনে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় সবচেয়ে সরাসরি ব্যবহৃত ঘাঁটি ছিল আরএএফ ফেয়ারফোর্ড। যুদ্ধের একেবারে প্রথম দিনগুলো থেকেই এই ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৬ মার্চ থেকে গ্লুচেস্টারশায়ারের ঘাঁটিটিতে মার্কিন বি-১বি ল্যান্সার বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। এসব বিমান থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।
৯ মার্চ তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বি-৫২ বোমারু বিমান। ফ্লাইটের তথ্য ও উন্মুক্ত সূত্রের ভিত্তিতে জানা যায়, ১৩ মার্চের মধ্যে ফেয়ারফোর্ডে বোমারু বিমানের সংখ্যা বেড়ে ১৮টিতে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ছিল ১২টি বি-১বি ও ছয়টি বি-৫২।
এই মোতায়েন ছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ২৮ ফেব্রুয়ারি এই অভিযান শুরু করেছিল।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কিন বলেন, যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান থেকে শুরু করে ট্যাংকার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমানসহ ১০০টির বেশি বিমান সমন্বিতভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় এসব বিমান ১ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল কমান্ড সেন্টার, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ইরানের গোয়েন্দা অবকাঠামো ও নৌবাহিনী।
যুদ্ধের শুরুতে বি-২ বোমারু বিমানও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে ৩৭ ঘণ্টার যাওয়া-আসার মিশন পরিচালনা করে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ব্রিটেন জোর দিয়ে বলেছিল, তারা প্রাথমিক হামলায় অংশ নেয়নি। তবে ১ মার্চ সন্ধ্যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ঘোষণা করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংসে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য ওয়াশিংটনের অনুরোধে লন্ডন সম্মতি দিয়েছে।
ব্রিটিশ সরকার এই অনুমতিকে মিত্র ও ব্রিটিশ নাগরিকদের সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার কাঠামোর মধ্যে একটি সীমিত ও ‘প্রতিরক্ষামূলক’ ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করে।
তবে ইরানের অভ্যন্তরে পরিচালিত হামলার কারণে এই ব্যাখ্যা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। ২০ মার্চ লন্ডন নিশ্চিত করে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও সক্ষমতার বিরুদ্ধে হামলার ক্ষেত্রেও এই অনুমতি প্রযোজ্য।

ইউরোপের ঘাঁটিগুলোর মধ্যে ফেয়ারফোর্ডই সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। এই ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ব্রিটেনের অন্য ঘাঁটিগুলো মূলত মার্কিন বাহিনীর পরিবহন ও সহায়তা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। খবর অনুসারে, ফেয়ারফোর্ডে এখনো প্রায় এক ডজন মার্কিন বি-১বি বোমারু বিমান রয়েছে। তবে বি-৫২ বিমানগুলো এরই মধ্যে চলে গেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী সেখানে মোতায়েন বোমারু বিমানের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। এই হিসাব উন্মুক্ত সূত্র ও ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
ওয়ারশভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০টি এফ-৩৫ ও ৩৬টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ব্রিটেন থেকে ইসরায়েল ও জর্ডানে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
লেইকেনহিথ ও ওয়েলফোর্ডের মতো ঘাঁটিগুলো বাহিনী মোতায়েন, স্থানান্তর ও শক্তিবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
তবে ব্রিটিশ সরকার জোর দিয়ে বলেছে, সাইপ্রাসে তাদের অ্যাক্রোতিরিসহ ঘাঁটিগুলো আক্রমণাত্মক অভিযান বা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় ব্যবহার করা হয়নি। ২ মার্চ অ্যাক্রোতিরিতে ড্রোন হামলা হলে সীমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ড্রোনটি ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়নি। সম্ভবত এটি লেবানন বা ইরাক থেকে উড়ে এসেছিল।
পর্তুগালের আজোরেসে অবস্থিত লাজেস ঘাঁটিতেও যুদ্ধ শুরুর আগেই মার্কিন সামরিক বিমানের চলাচল বেড়ে গিয়েছিল। পর্তুগিজ সরকার জানায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ১৯৫১ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিটি ব্যবহার করতে পারে। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামরিক অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্লাইটের জন্য লিসবনের পৃথক অনুমতি প্রয়োজন ছিল।
৭ এপ্রিল পর্যন্ত পর্তুগাল যুদ্ধ-সংক্রান্ত কাজে লাজেসে মার্কিন সামরিক বিমানের ৭৬টি অবতরণ এবং দেশটির আকাশসীমা দিয়ে ২৫টি উড্ডয়ন অনুমোদন করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী লুইজ মন্টেনেগ্রোর সরকার বলেছিল, কেবল ‘প্রতিরক্ষামূলক’, প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ মিশনের জন্যই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলায় পর্তুগিজ স্থাপনা ব্যবহারের অনুমতি নেই বলেও জানানো হয়।
পর্তুগিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নিশ্চিত করেন, লিসবন ওয়াশিংটনের কিছু অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বাস্তবে লাজেস মার্কিন অভিযানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও সহায়তা কেন্দ্র ছিল। তবে জনসম্মুখে থাকা তথ্য ইঙ্গিত করে না যে, এই ঘাঁটি থেকে সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো হামলা চালানো হয়েছিল।
ফ্রান্সও মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা ও যুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করে। ৫ মার্চ ফরাসি সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ ঘোষণা করে, মার্কিন সহায়ক বিমানগুলো সাময়িকভাবে ফরাসি ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। তবে তারা কোনোভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিতে পারবে না।
পরে লা মঁদ জানায়, সি-১৭ পরিবহন বিমান ও কেসি-১৩৫ ট্যাংকার ইস্টার ও আভর ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে এই অনুমতির আওতায় যুদ্ধবিমান ছিল না।
মার্চের শেষ দিকে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়। ইরান যুদ্ধ-সংক্রান্ত মার্কিন অস্ত্র পরিবহনে ইসরায়েলের জন্য ফরাসি আকাশসীমা ব্যবহারে প্যারিস আপত্তি তোলে। তবে ফ্রান্স সামরিক ফ্লাইটের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। প্রতিটি অনুরোধ আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

স্পেন ইউরোপীয় ঘাঁটি যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন, মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও মোরোন ও রোতা ঘাঁটি স্পেনের সার্বভৌমত্বের অধীন। ইরানে হামলার জন্য এগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এই সিদ্ধান্তের পর ১৫টি মার্কিন সামরিক বিমান, প্রধানত কেসি-১৩৫ ট্যাংকার, ওই ঘাঁটিগুলো ছেড়ে যায়। এর মধ্যে অন্তত সাতটি জার্মানির রামস্টাইন বিমানঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হয়।
মাদ্রিদের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত ওয়াশিংটনের সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রূপ নেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেন। এই বিরোধকে নেটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে দুই দেশের আগের মতবিরোধের সঙ্গেও যুক্ত করেন তিনি।
ফলে ইরানে হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের বিরোধিতা করা ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে স্পেন সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণে পরিণত হয়।
জার্মানি ঘোষণা করেছিল, তারা যুদ্ধে অংশ নেবে না। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে বাধাও দেয়নি।
যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযান নেটোর মিশন নয়। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বার্লিনের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেনি।
তবুও রামস্টাইনে মার্কিন অভিযান চলতে থাকে। জার্মান সরকার জানায়, মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি ব্যবহার বিদ্যমান মোতায়েন চুক্তির আওতায় ছিল। ওয়াশিংটন এসব চুক্তি লঙ্ঘন করেছে—এমন কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি।
এই অবস্থান জার্মানির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করে। কারণ অনেকের মতে, আইনি বৈধতা নিয়ে বিতর্কিত একটি অভিযানের ক্ষেত্রে বার্লিনের সম্ভাব্য দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
রামস্টাইন কার্যত একটি বড় পরিবহন ও সহায়তা কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্পেনে বিধিনিষেধ আরোপের পর সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও সেখানে অবস্থান নেয়।
সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের মতে, মার্কিন কিছু নির্দেশিত অস্ত্র রামস্টাইন থেকে এসেছে বলে ‘জোরালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
জার্মানির স্প্যাংডালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত এফ-১৬ ‘ওয়াইল্ড উইজেল’ যুদ্ধবিমানও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছিল। পরে এসব বিমান ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা দমন অভিযানে অংশ নেয়।
ইতালিও মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানার চেষ্টা করে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আভিয়ানোয় অবস্থানরত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার জোর দিয়ে বলেছিল, দেশের ঘাঁটিগুলো কেবল প্রযুক্তিগত, লজিস্টিক ও অ-যুদ্ধ কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
২৭ মার্চ এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়। সেদিন রোম সিগোনেলায় কয়েকটি মার্কিন সামরিক বিমান অবতরণের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইতালীয় সরকারের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নেয়নি। ঘাঁটি ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী দেশটির সামরিক কমান্ডের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়নি।
জুনে ইতালীয় ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা আবারও বিতর্কের জন্ম দেয়। নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সমর্থনে প্রায় ৫০০ মার্কিন বিমান ইতালির ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে।

এর জবাবে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, রোম কেবল প্রযুক্তিগত, লজিস্টিক ও অ-যুদ্ধ কার্যক্রম অনুমোদন করেছিল। এর বাইরে কোনো অনুরোধ গ্রহণ করা হয়নি।
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সুদা ঘাঁটির ভূমিকা ছিল মূলত নৌ ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাওয়ার আগে সরবরাহ নিতে সুদায় থামে। অভিযান চলাকালে অগ্নিকাণ্ডের পর সাময়িক বিরতির জন্য আবারও ঘাঁটিটিতে ফেরার কথা ছিল।
তবে গ্রিসে সুদা ঘাঁটির ব্যবহার নিয়ে বিরোধিতা ছিল। ক্রিট দ্বীপে একদল মানুষ বিক্ষোভ করে। একই সময়ে ঘাঁটির নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়।
অন্য একটি ঘটনায় গ্রিক কর্তৃপক্ষ ঘাঁটিটিকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন এক গুপ্তচর এবং ইরানে থাকা কারও সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য যোগাযোগের তদন্ত শুরু করে। তবে আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব কর্মকাণ্ডকে ইরান সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কোনো কারণ নেই বলে তারা জানায়।
ইরান-সংক্রান্ত মার্কিন অভিযানে ইউরোপের সহায়তা নেটওয়ার্ক পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইরান-সংক্রান্ত অভিযানের জন্য আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, নজরদারি সরঞ্জাম ও স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা মোতায়েনে সম্মতি দেয় রোমানিয়া।
ওই সময় রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোশের ডান এসব সরঞ্জামের ‘প্রতিরক্ষামূলক’ চরিত্রের ওপর জোর দেন। সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলের অনুমোদনের পর পার্লামেন্টে এই সিদ্ধান্ত পাস হয়। তবে ডানপন্থী উগ্র দলগুলো এর বিরোধিতা করেছিল।
তবে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো ঠিক কোথায় মোতায়েন করা হয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির কারণে মিহাইল কোগালনিচানু ঘাঁটির নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে মিশনটি ওই ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয়েছিল—এমনটি নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
যোগাযোগ সরঞ্জামগুলোকে ডোসলভ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
বুলগেরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর মার্কিন সহায়তা নেটওয়ার্কের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়। ২২ জুলাই দেশটির পার্লামেন্ট বেজমার ঘাঁটিতে সর্বোচ্চ আটটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান ও ২৫০ জন মার্কিন সেনা সাময়িকভাবে মোতায়েনের অনুমোদন দেয়।
সোফিয়া জোর দিয়ে বলে, বুলগেরিয়ার ভূমি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি হামলা চালানো হবে না। এই মোতায়েন কেবল সহায়তামূলক ও লজিস্টিক প্রকৃতির বলেও জানানো হয়।
বাস্তবে ৩১ জুলাই দুটি কেসি-১৩৫ বিমান বেজমারে পৌঁছায়। এই মোতায়েন স্থানীয় কিছু বাসিন্দার বিক্ষোভ ও ইরানের কূটনৈতিক আপত্তির মুখে পড়ে।
নির্ধারিত সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগেই ২১ আগস্ট দুটি বিমান বুলগেরিয়া ছেড়ে যায়। মোতায়েন শেষ হওয়ার পর বুলগেরিয়ার কর্মকর্তারা বলেন, বিমানগুলো দক্ষিণমুখী কোনো ফ্লাইট পরিচালনা করেনি। তাদের কার্যক্রম নেটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তুরস্কের ইনজিরলিক বিমানঘাঁটিতেও মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। তবে তুরস্ক বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় এই ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন।
যুদ্ধ চলাকালে তুরস্কের ভূমিকা মূলত নিজস্ব আকাশসীমা সুরক্ষা ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আঙ্কারা বলেছে, ইরান থেকে উৎক্ষেপিত এবং তুর্কি আকাশসীমার দিকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়।
ইনজিরলিক তুরস্কের এশীয় অংশের আদানা শহরে অবস্থিত। কঠোর ভৌগোলিক সংজ্ঞায় এটি ইউরোপীয় ঘাঁটি নয়।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

