ভারতের উত্তরপ্রদেশের আলিগড় জেলায় গাড়িতে গরুর মাংস বহন করা হচ্ছে-এমন সন্দেহে চার মুসলিম যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করেছে সেখানকার তথাকথিত ‘গোরক্ষক’ বাহিনীর সদস্যরা। একইসঙ্গে তাদের গাড়িতেও আগুন দেয় তারা। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৪ মে।
আহতরা হলেন আকিল, নাদিম, কাদিম ও আরবাজ। এদের বয়স ৩২ থেকে ৪৩ বছরের মধ্যে। তাদের আলিগড়ের জওহরলাল নেহরু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পুলিশ জানায়, আহতরা সবাই ওই জেলার আত্রৌলি শহরের বাসিন্দা। হামলার শিকার আকিলের বাবা সেলিম খান শনিবার হরদুয়াগঞ্জ থানায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে একটি এজাহার দায়ের করেন। পরে রোববার তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এছাড়া বিজয় বজরঙ্গীর অভিযোগের ভিত্তিতে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশ গোহত্যা প্রতিরোধ আইনের অধীনে আরেকটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
বর্বর এই হামলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই চার যুবককে বিবস্ত্র করে ধারালো অস্ত্র, ইট, লাঠি ও রড দিয়ে পেটানো হয়। গুরুতর আহত হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। আহত আকিলের বাবা সেলিম খান বলেছেন, ভিডিওটি দেখলেই বোঝা যায় কতটা নির্মমভাবে তার সন্তানসহ অন্যদের পেটানো হয়েছে। এটা বর্ণনাতীত। আকিল এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
সেলিম খান তার দায়ের করা এজাহারে লিখেছেন, ২৪ মে আলিগড়ের কাছে ‘আল-আম্মার ফ্রোজেন ফুডস মিট ফ্যাক্টরি’ থেকে মাংস কিনে নিজেদের পিকআপ ট্রাকে করে আত্রৌলিতে ফিরছিল তার ছেলেসহ বাকিরা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হরদুয়াগঞ্জ থানার কাছে সাধু আশ্রমের কাছে তাদের গাড়িটি থামানো হয়। জায়গাটি থানার খুব কাছেই। এ সময় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো দাবি করে যে, ট্রাকে করে গরুর মাংস পাচার করা হচ্ছেÑএমন খবর আছে তাদের কাছে। সেলিম অভিযোগ করেন, গোরক্ষক বাহিনী ওই চারজনকে গাড়ি থেকে জোর করে নামিয়ে কেনা মাংসের বিলের কাগজ ছিড়ে ফেলে। তারপর তাদের কাছে ৫০ হাজার রুপি দাবি করে। তাহলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও জানায় তারা। এ সময় আকিল ও তার চাচাতো ভাই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে; তারপর গাড়ি ভাঙচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আক্রমণকারীরা চারজনের মোবাইল ফোন এবং টাকা লুট করে নিয়ে যায়। আক্রমণকারীরা তাদের মাংস রাস্তায় ফেলে দেয়- ভিডিওতে এমন চিত্রও দেখা গেছে। হামলাকারীরা পুলিশ আসার আগেই তিনজনকে প্রায় মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়ে যায়। তবে ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ আসার পরও হামলাকারীরা মারধর অব্যাহত রেখেছিল। এফআইআরে যে ১৩ অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে স্থানীয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা রাজকুমার আরিয়া ও বিজেপি নেতা অর্জুন সিংয়ের নাম রয়েছে।
এদিকে, এসপি অমৃত জৈন সাংবাদিকদের জানান, গাড়িতে কীসের মাংস ছিল, তা জানতে মাংসের নমুনা সংগ্রহের জন্য পাঠানো হয়েছে। সব অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি দাবি করেন, খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং গণপিটুনিতে আহত চারজনকে নিরাপদে উদ্ধার করে দীনদয়াল উপাধ্যায় হাসপাতালে ভর্তি করায়।
অন্যদিকে, ফ্যাক্ট চেকার এবং অল্ট নিউজ সাইটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ যুবায়ের ‘আল-আম্মার ফ্রোজেন ফুডস মিট ফ্যাক্টরি’ নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এই দোকানটি মহিষের মাংস বিক্রির জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত। এছাড়া তিনি দোকাটির সনদ এবং ভারতের ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি’র দেওয়া সার্টিফিকেট পোস্ট করেন।
তিনি আল-আম্মার কারখানার গেটপাসের একটি ছবিও পোস্ট করেন, যেখানে আহত কাদিমের সই রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

