লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলভিত্তিক পার্লামেন্টে দীর্ঘ ১২ বছর পর নেতৃত্বের পরিবর্তন দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন স্পিকার হিসেবে আল-সালেহিন আবদুন নবী আল-আবিদির নির্বাচিত হওয়াকে পূর্বাঞ্চলের সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের প্রভাব আরো সংহত হওয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে এ পরিবর্তন দেশটির বিভক্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টাকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
১২ বছরের নেতৃত্বের অবসান
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার আগুইলা সালেহ ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সম্প্রতি পার্লামেন্টের সদস্যরা স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারদের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ মাসে সীমিত করার বিধান অনুমোদন করেন। এর পরদিন নতুন স্পিকার নির্বাচিত হন আল-সালেহিন আবদুন নবী আল-আবিদি।
তবে আগুইলা সালেহ নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে আইনগতভাবে অবৈধ বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, তিনি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই সিদ্ধান্ত নিতেন। কয়েক সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টের সদর দপ্তরে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছিল।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের পেছনে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কাজ করে থাকতে পারে। তবে নতুন নিয়মে স্পিকারের মেয়াদ সীমিত হওয়ার ফলে পদটির স্বাধীনতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের সামরিক নেতৃত্বের প্রভাবের প্রেক্ষাপটে।
হাফতারের প্রভাব বলয়ে নতুন স্পিকার
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসের ব্যাপক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। নতুন স্পিকার আল-আবিদির নিয়োগকে এই ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে পার্লামেন্টের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত।
আল-আবিদি ও আগুইলা সালেহ—দুজনই ওবেইদাত গোত্রের সদস্য। পূর্বাঞ্চলের সাইরেনাইকা অঞ্চলে এই গোত্রের উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে; তবরুক এলাকায় তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একই গোত্র থেকে নতুন স্পিকার নির্বাচনের ফলে স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং গোত্রভিত্তিক অসন্তোষ এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নেতৃত্বের পরিবর্তনের তাৎপর্য শুধু গোত্রীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল-আবিদি অতীতে লিবিয়া-তুরস্ক পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ফলে তুরস্কের সঙ্গে তার যোগাযোগ পূর্বাঞ্চলের নেতৃত্বকে আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম লিবিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পূর্বাঞ্চলের হাফতারপন্থী শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এ অবস্থায় নতুন স্পিকারের কূটনৈতিক যোগাযোগ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় কতটা কার্যকর হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগে নতুন অনিশ্চয়তা
লিবিয়ার রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রীয় সমস্যা হলো, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও সশস্ত্র শক্তির প্রভাব বজায় রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার এবং পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক-সামরিক কাঠামোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা, বৈধতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছে।
আগস্টে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার মাধ্যমে ২৪ মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন আয়োজনের রূপরেখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ৫ অক্টোবর ত্রিপোলিভিত্তিক উচ্চ পরিষদ ওই সমঝোতার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।
এমন পরিস্থিতিতে পূর্বাঞ্চলের পার্লামেন্টে নেতৃত্ব পরিবর্তন জাতীয় সমঝোতার প্রক্রিয়ায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সামরিক নেতৃত্বের প্রভাববলয়ে আরও কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে নেতৃত্ব পরিবর্তন নিজে থেকেই জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনা শেষ করে দেয় না। নতুন স্পিকার যদি পার্লামেন্টের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারেন এবং নির্বাচনের রূপরেখা নিয়ে অন্য রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা এগিয়ে নিতে পারেন, তাহলে সমঝোতার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তেলসম্পদ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের নিয়ন্ত্রণ
লিবিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গভীরভাবে যুক্ত। দেশটির অর্থনীতি তেল ও গ্যাসনির্ভর। জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি এবং সরকারি রাজস্বের ৯৫ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে।
তাই বাজেট অনুমোদন, উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের ওপর প্রভাব বিস্তার করা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন ও বাজেট অনুমোদনের মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ত্রিপোলিভিত্তিক লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকই রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা ও অর্থপ্রদানের প্রধান কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করছে। ফলে পূর্বাঞ্চলের পার্লামেন্টে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেই জাতীয় কোষাগারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বদলে যায় না। তা সত্ত্বেও বাজেট অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতাকাঠামোর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
নতুন স্পিকার যদি সামরিক নেতৃত্বের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হন, তাহলে প্রতিরক্ষা ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের সিদ্ধান্তে পার্লামেন্টের স্বাধীন নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
পুনর্গঠন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে পুনর্গঠন ও অবকাঠামো উন্নয়নও ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। খলিফা হাফতারের ছেলে বেলকাসেম হাফতার লিবিয়া ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন ফান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তহবিলটি পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত।
তহবিলটির আর্থিক তদারকি এবং পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসনের বৃহত্তর ব্যয়ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। বেলকাসেম হাফতার অবশ্য তহবিলের নিরীক্ষাব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত জাতীয় বাজেটের বাইরে ব্যয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে স্বাধীন নিরীক্ষা, চুক্তি প্রকাশ এবং পার্লামেন্টারি তদারকির গুরুত্ব বেড়েছে। সামরিক, আইনপ্রণয়ন ও উন্নয়নসংক্রান্ত কর্তৃত্ব যদি পরস্পর-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নতুন স্পিকারের সামনে তাই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে—পার্লামেন্ট উন্নয়ন প্রকল্পের চুক্তি যাচাই করতে পারে কি না, সরকারি অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে কি না এবং সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের স্বাধীন পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে পারে কি না।
মিসর-তুরস্কের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা
লিবিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মিসর পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নিজের সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করে। অন্যদিকে তুরস্ক পশ্চিম লিবিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
পূর্বাঞ্চলের পার্লামেন্টের সঙ্গে আরও পূর্বানুমানযোগ্য সম্পর্ক মিসরের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গে আল-আবিদির পূর্ববর্তী সংসদীয় যোগাযোগ আঞ্চলিক সম্পর্ক পরিচালনায় নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এসব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নতুন স্পিকার কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং লিবিয়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন তার ওপর।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রকৃত পরীক্ষা
লিবিয়ার নতুন পার্লামেন্টারি নেতৃত্বের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন স্পিকার নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক, পার্লামেন্টের স্বাধীনতা বজায় রাখা, রাষ্ট্রীয় অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং জাতিসংঘ-সমর্থিত নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া।
শুধু নিয়মিত পার্লামেন্ট অধিবেশন আয়োজন করলেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর স্বাধীনতা প্রমাণিত হবে না। বরং বাজেট ও পুনর্গঠন প্রকল্পের ব্যয় যাচাই, চুক্তি প্রকাশ, নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই নতুন নেতৃত্বের প্রকৃত ভূমিকা মূল্যায়ন করা সম্ভব।
লিবিয়ার সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং সেখান থেকে পাওয়া আর্থিক ও রাজনৈতিক সুবিধার বড় ভূমিকা রয়েছে। নতুন স্পিকারের উত্থান পূর্বাঞ্চলের ক্ষমতাকাঠামোকে আরো সংহত করবে, নাকি পার্লামেন্টকে জাতীয় সমঝোতার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলবে—তা এখনো নিশ্চিত নয়।
শেষ পর্যন্ত আল-আবিদির নেতৃত্বের সাফল্য নির্ভর করবে তিনি সামরিক-রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে পার্লামেন্টের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেন কি না এবং বিভক্ত লিবিয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে পারেন কি না, তার ওপর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

