গাজায় জীবনযাপনের প্রত্যক্ষদর্শী এজিদ্দিন শেহাব

ইসরাইলি সেনাদের নৃশংসতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র নাজা

ইসরাইলি সেনাদের নৃশংসতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র নাজা

গাজার ভয়াবহতা আমি নিজের চোখে দেখেছি। দেখেছি, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে পুরো আবাসিক এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়, কীভাবে বাড়িঘরে মানুষ থাকা অবস্থায় বোমা হামলা চালানো হয়, আর কীভাবে পরিবারগুলো অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। দুবার সেই দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। তাই গাজায় কী ঘটেছে, তা জানতে কোনো চলচ্চিত্র দেখার প্রয়োজন ছিল না।

তার পরও সম্প্রতি ‘নাজা’ চলচ্চিত্রটি দেখেছি। গাজায় কী ঘটেছিল, তা জানার জন্য নয়; বরং যে মানুষগুলো এসব ঘটিয়েছে, তারা কীভাবে নিজেদের কাজকে ন্যায্য বলে মনে করে, তা বোঝার জন্য। হলোকাস্টের স্মৃতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ কীভাবে অন্য একটি জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ নৃশংসতাকে সমর্থন করতে পারেন? একসময় যারা নিজেরাই নির্যাতনের শিকার হওয়ার ইতিহাস বহন করেন, তারা কীভাবে অন্যের ওপর নিপীড়ন চালানোর পক্ষে দাঁড়ান? তারা কি কখনো অনুশোচনা করেন? নিজেদের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা কি তারা বুঝতে পারেন? এসব কথা বলার সময় তাদের কি লজ্জা হয়? কখনো তাদের কারও মুখোমুখি হলে তিনি কি আমার চোখের দিকে তাকাতে পারবেন? রাতে তারা কীভাবে ঘুমান? বিবেককে কীভাবে এতটা নীরব করে রাখেন? আমার কাছে চলচ্চিত্রটির গুরুত্ব এখানেই।

বিজ্ঞাপন

এবার শুনতে চেয়েছি অপরাধীদের কথা

বিশ্ব বহুদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের অভিজ্ঞতা ও সাক্ষ্য শুনছে। এই যুদ্ধের বড় একটি সময়জুড়ে আমিও মানুষকে জানিয়েছি, গাজায় নিজের চোখে কী দেখেছি। কিন্তু এবার কথা বলছেন এমন কিছু মানুষ, যারা সরাসরি সামরিক ব্যবস্থার অংশ ছিলেন। তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত, কর্মকাণ্ড এবং আমাদের জীবন-মৃত্যুকে কীভাবে দেখেছেন, সে সম্পর্কে কথা বলেছেন।

এ কারণেই চলচ্চিত্রটিতে ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইসরাইলিদের বক্তব্য বেশি জায়গা পেয়েছে—এমন সমালোচনার সঙ্গে আমি একমত নই। আমি যা দেখেছি, তা সত্যি ছিল—এ কথা প্রমাণ করতে কোনো ইসরাইলি সেনার প্রয়োজন নেই। আমি সেখানে ছিলাম। আমি জানি, কী ঘটেছে। তবে আমি শুনতে চাই, তিনি নিজের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা কীভাবে দেন। নিজের কাছে সেসব কাজকে কীভাবে ন্যায্য প্রতিপন্ন করেন, তা বুঝতে চাই।

অপরাধীর সাক্ষ্য কখনো ভুক্তভোগীর সাক্ষ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় না। কিন্তু সেই সাক্ষ্য এমন কিছু বিষয় সামনে আনতে পারে, যা ভুক্তভোগীর পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। আমরা যখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটছিলাম, তখন অন্য প্রান্তে কী ঘটছিল, তা জানা যায় তাদের বক্তব্য থেকে।

গাজা ছেড়ে আসার পর থেকে সেখানকার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছি। এমনভাবে ঘুমাতে শিখতে চাই, যাতে ঘুমের মধ্যে আবার যুদ্ধের সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে না হয়। মানুষের ভিড়ে বসেও যেন হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ দেখতে না হয়, কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোর কথা মনে না পড়ে। কিন্তু চলচ্চিত্রটি দেখতে গিয়ে বুঝলাম, গাজা ছেড়ে চলে আসার অর্থ স্মৃতিগুলোও পেছনে ফেলে আসা নয়।

কল্পিত সেই সীমারেখা, যার ওপারে মৃত্যু

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী আমাদের যে এলাকা ছিলাম, সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সেটি নিছক কোনো বার্তা বা সতর্কতা ছিল না। আমাদের বাড়ির দেয়ালে গোলা এসে আঘাত করছিল। আমি ও আমার মা যখন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলাম, তখন সামনের রাস্তায়ও গোলা পড়তে শুরু করে। আমরা বুঝেছিলাম, সেখান থেকে চলে যেতেই হবে। কিন্তু কোথায় যাব, তা জানতাম না।

মনে হচ্ছিল, চারদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। নিরাপদ কোনো রাস্তা ছিল না, কোন দিকে যেতে হবে, তা বলার মতো কেউ ছিল না। আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম। কয়েক পা এগোলেই সামনের দেয়ালে গুলি এসে লাগত। তখন বুঝতে পারতাম, ওই পথে আর এগোনো যাবে না। আমরা শিখছিলাম, কোথায় যাওয়া যাবে, আর কোথায় যাওয়া যাবে না—আমাদের দিকে ছুটে আসা গুলির মাধ্যমে।

চলচ্চিত্রে একজন ইসরাইলি সেনাকে বলতে শুনলাম, এমন কোনো দিন যায়নি, যেদিন কাউকে হত্যা করা হয়নি। তিনি একটি সম্মতিভিত্তিক ‘কল্পিত সীমারেখার’ কথা বলছিলেন। সেই সীমা অতিক্রম করলেই গুলি করে হত্যা করা হতো।

চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, মানুষ কীভাবে বুঝবে সেই সীমারেখা কোথায়? সেনাটি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখতে হবে।’ অর্থাৎ, রক্তের বিনিময়ে। ‘রক্তের বিনিময়ে’—কথাটি আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের সঙ্গেও ঠিক এই ভাষাতেই আচরণ করা হয়েছিল। সেদিন আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, চলচ্চিত্রটি দেখতে গিয়ে প্রথমবার অন্য পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে তা বুঝতে পারলাম।

আমরা প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় ছুটছিলাম। অথচ কোথাও কেউ বিশ্বাস করছিলেন, মানুষকে কোথায় দাঁড়াতে দেওয়া হবে, তা শেখানোর জন্য তাদের দিকে গুলি চালানো সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। তার কাছে সেটি ছিল নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত একটি কল্পিত সীমারেখা। আর আমাদের কাছে সেটিই ছিল জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য—আরেকটি পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা চিরতরে থেমে যাওয়ার ব্যবধান।

ওই সেনা আরো বলেছিলেন, সেখানে ১৪০ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সবাই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। চলচ্চিত্র নির্মাতা আবারও তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তাদের কারও কাছে কি অস্ত্র ছিল না? সেনাটি উত্তর দিয়েছিলেন, না, তাদের কেউই সশস্ত্র ছিলেন না।

১৪০ জন মানুষ! কথাটি শুনে বারবার মনে পড়ছিল, বোমা হামলার পর আমরা কতবার শুনেছি—সেনাবাহিনী কোনো ‘হুমকি’, ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তি’ কিংবা ‘সামরিক অভিযান পরিচালনার এলাকা’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এমন শব্দের আড়ালে কত মানুষ হারিয়ে যান? কত মানুষের জীবনকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না?

গাজার শিশুরাও রেহাই পায়নি

এরপর আসে একটি শিশুর গল্প। ওই সেনা জানান, তাদের ক্যামেরায় দেখা গিয়েছিল, একটি শিশু নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করছে। শিশুটি সেখানে কেন গিয়েছিল, তা তারা জানতেন না। শিশুটি কিছুই করছিল না। সে শুধু সেখানে ছিল। আর এ কারণেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

একটি শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল, কারণ সে জানত না—সশস্ত্র ব্যক্তিরা একটি কল্পিত সীমারেখা টেনে রেখেছেন এবং সেই সীমা অতিক্রম করলে মৃত্যুই তার শাস্তি। শিশুটি কোনো অপরাধ করার কারণে নিহত হয়নি; বরং সে যে নিয়মের কথা জানতই না, সেই নিয়ম না জানার কারণেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

চলচ্চিত্রটি দেখার পর থেকে শিশুটির কথা বারবার মনে পড়ছে। একবার ভাবুন, মানুষ জানে অন্য মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, তাদের মরদেহ কুকুরের খাবারে পরিণত হচ্ছে; অথচ এ নিয়ে আপত্তি জানানোকে সে নিজের পেশাগত দায়িত্বের বাইরে বলে মনে করছে!

শিশুটি কি তার মা-বাবাকে খুঁজছিল? পথ হারিয়ে ফেলেছিল? নিজের বাড়ি খুঁজতে বের হয়েছিল? সে কি জানত, কেউ তাকে নজরে রাখছে এবং কোথাও বসে থাকা একজন মানুষ একটি বোতাম চাপলেই তার জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।

কিন্তু গাজার শিশুদের আমি চিনি। জানি, তারা কীভাবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। পানি, খাবার কিংবা হারিয়ে যাওয়া স্বজনের খোঁজে কীভাবে বেরিয়ে পড়ে। কোনো শিশু শুধু ভুল জায়গায় চলে যাওয়ার কারণে নিহত হয়েছে—এ কথা ভাবলে এর চেয়ে বর্বরতার আর কোনো নাম খুঁজে পাই না।

এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতা ওই সেনার কাছে জানতে চান, এসব এলাকায় নিহত বেসামরিক মানুষের লাশের কী হয়েছিল? যারা জানতেনই না, কোন রাস্তা পর্যন্ত তাদের চলাচলের অনুমতি রয়েছে, তাদের লাশের পরিণতি কী হয়েছিল? সেনাটি কিছুক্ষণ নীরব ছিলেন। এরপর বলেন, কুকুর সেগুলো খেয়ে ফেলেছিল। তিনি জানান, নিজে ঘটনাটি দেখতে পারেননি। তবে তার সঙ্গে থাকা অন্যরা কুকুরকে লাশ খেতে দেখেছিলেন।

চলচ্চিত্র নির্মাতা জানতে চান, তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারতেন না? সেনাটির উত্তর ছিল, সেটি তার দায়িত্ব নয়। তার দায়িত্ব ছিল কেবল কারিগরি বিষয়ে। নৈতিক অবস্থান নেওয়া তার কাজের অংশ ছিল না। একবার ভাবুন, একজন মানুষ জানেন যে অন্যদের হত্যা করা হচ্ছে এবং তাদের লাশ কুকুরের খাবারে পরিণত হচ্ছে। তারপরও তিনি মনে করেন, এমন ঘটনায় আপত্তি জানানো তার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

‘শুধু আদেশ পালন করেছি’

সেনাটির এই উত্তর আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন মানুষের বিবেক থাকতে হলে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি লাগবে কেন? আমার মনে পড়েছিল নুরেমবার্গের বিচারপ্রক্রিয়ার কথা। নাৎসিদের অপরাধের পর বিশ্ব যে অজুহাত শুনেছিল, তা হলো—‘আমরা শুধু আদেশ পালন করেছি।’

এই কথার মাধ্যমে অপরাধীরা দায়মুক্তি পাননি। অথচ এখন আমরা আরও শীতল এক ব্যাখ্যা শুনছি—আমি শুধু কারিগরি দিকের দায়িত্বে ছিলাম, নৈতিক বিষয়টি আমার কাজ নয়। যেন একটি অপরাধকে ছোট ছোট দায়িত্বে ভাগ করে দিলে সেটি আর অপরাধ থাকে না।

একজন নজরদারি করেন, আরেকজন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেন, তৃতীয় ব্যক্তি অনুমতি দেন, চতুর্থজন বোতাম চাপেন। শেষ পর্যন্ত একজন মানুষ মারা যান। এরপর প্রত্যেকে হয়তো বাড়ি ফিরে যান। ভাবেন, তাকে যে ছোট্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি শুধু সেটুকুই পালন করেছেন। কিন্তু মানুষটি তো মারা গেছেন। তাহলে তার মৃত্যুর দায় কার?

আমি তাদের সাক্ষ্য থেকে অন্য কিছু খুঁজছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম, এসব ঘটানোর পর তাদের ভেতরে কী হয়েছিল। তারা কি নিহত মানুষগুলোর কথা ভেবেছিলেন? সেই মুখগুলো কি কখনো তাদের স্মৃতিতে ফিরে এসেছিল? স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও কি তারা সেই স্মৃতি বহন করতেন? তাদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন এসেছিল কি?

একজন সেনা বলেছিলেন, একবার পোল্যান্ডে গিয়ে তিনি ভেবেছিলেন, জার্মান সমাজ কীভাবে নিজেদের অতীতের অপরাধের পরও স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যেতে পেরেছে। পরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিষয়টি কত সহজ হতে পারে। একজন মানুষ কোনো জায়গায় বোমা হামলা চালিয়ে সেদিন সন্ধ্যাতেই নিজের ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সময় নিয়ে চিন্তা করতে পারেন।

আরেকজনের বলা একটি কথা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ভবনটি ধসিয়ে দিয়েছিলাম, তারপর সেদিন রাতেই বন্ধুদের সঙ্গে বিয়ার পান করতে বেরিয়েছিলাম।’ কথাটি শুনে আমার ভেতরে কী অনুভূতি হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

যেদিন ধ্বংস হয়েছিল আমার পরিবার

এখনো এমন একটি রাত কাটাতে পারিনি, যেদিন ঘুমের মধ্যে যুদ্ধের স্মৃতি ফিরে আসেনি। আর সেই মানুষটি বলছেন, একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস করার পর তিনি বন্ধুদের সঙ্গে সাধারণ একটি সন্ধ্যা কাটাতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন সেখানে কেউ ছিলই না।

হঠাৎ আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগে উঠল, যা কিছুতেই সরাতে পারছিলাম না। তিনি যে ভবনটি ধ্বংস করার কথা বলছিলেন, সেটি কি আমার পরিবারের বাড়ি হতে পারে? ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর বোমা হামলায় আমার পরিবারের ৪২ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন। সেই বাড়িটিই কি ছিল তার ধ্বংস করা ভবন?

আমরা যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রিয়জনদের খুঁজছিলাম, হারানো মানুষগুলোর জন্য কাঁদছিলাম, তখন কি তাদের হত্যাকারী কোথাও বসে বন্ধুদের সঙ্গে বিয়ার পান করছিলেন? আমি জানি না, আমার পরিবারের বাড়িতে কে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। এটাও জানি না, এরপর তিনি কী করেছিলেন। কিন্তু এমনটা ঘটে থাকতে পারে—এই চিন্তাটুকুই আমাকে অসুস্থ করে দেওয়ার মতো যন্ত্রণা দিয়েছে। তিনি কি একবারও ভেবেছিলেন, পেছনে কী রেখে এসেছেন? কল্পনা করেছিলেন কি, কয়েক মিনিটের একটি কর্মকাণ্ডের কারণে কতগুলো পরিবারকে বাকি জীবন ধরে সেই ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে?

আমার দাদি সেই বাড়িতে ছিলেন। ছিলেন আমার বাবার ও মায়ের দিকের চাচা-মামারা, তাদের ছেলে-মেয়েরা এবং তাদের সন্তানরা। তারা ছিলেন আমার পরিচিত মানুষ। তাদের ভালোবাসতাম। জীবনের বহু বছর তাদের সঙ্গে কাটিয়েছি।

এখনো তাদের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে, মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে পড়ে একসঙ্গে কাটানো সাধারণ মুহূর্তগুলো, ছোট ছোট ঘটনা—যেগুলো অন্য কারও কাছে হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না।

যিনি বাড়িটিতে বোমা ফেলেছিলেন, তার কাছে হয়তো সেটি ছিল আরেকটি ভবন ধ্বংস করা, আরেকটি অভিযান সফলভাবে শেষ করা। কিন্তু আমার কাছে ওই বাড়িটির সঙ্গে জীবনের একটি অংশও শেষ হয়ে গেছে। তিন বছর পেরিয়ে গেছে। তারপরও আমি বারবার সেই দিনে ফিরে যাই। তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়, এখনো তা শেখার চেষ্টা করছি।

হত্যায় আনন্দ খুঁজে পাওয়া

তবে সেনাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সক্ষমতার চেয়েও যে বিষয়টি আমাকে বেশি ক্ষুব্ধ করেছে, তা হলো—তাদের কেউ কেউ হত্যার কথা এমনভাবে বলেছেন, যেন তারা বাধ্য হয়ে কাজটি করেননি; বরং এতে আনন্দ পেয়েছেন।

একজন অংশগ্রহণকারী বলেছিলেন, সংঘাত বাড়লে সেনারা নিজেদের মধ্যে আনন্দ করার কথা বলতেন। তাদের ভাষায়, সেটি ছিল ‘মজা, সত্যিকারের মজা’। কথাগুলো নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ভেবেছি।

গাজার হাসপাতালগুলোতে কাজ করার সময় আমি যথেষ্ট মৃত্যু দেখেছি। নিজের চোখের সামনে শিশুদের মারা যেতে দেখেছি। পরিবারগুলোকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখেছি। এমন মানুষদের দেখেছি, যাঁদের বাঁচাতে আমরা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিনি।

একজন মানুষকে হত্যা করা এমনিতেই ভয়াবহ। কিন্তু কাউকে হত্যা করে আনন্দ পাওয়া? এমন নিষ্ঠুরতা আমি বুঝে উঠতে পারি না। জীবনে যতটা দুর্ভোগ দেখেছি, তার চেয়েও বেশি কষ্ট দেখেছি বলে মনে হয়। কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যে কেউ কীভাবে আনন্দ খুঁজে পেতে পারেন, তা কখনো বুঝতে পারিনি।

আরো একটি বিষয় আমাকে ভাবিয়েছে। চলচ্চিত্রে একজন অংশগ্রহণকারী বলেছিলেন, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত অনেকেই কট্টর ডানপন্থী ছিলেন না। তাদের কেউ কেউ তেল আবিবের বাসিন্দা, এমনকি মধ্যপন্থী বাম রাজনীতির সমর্থকও ছিলেন। কথাটি নিয়ে বারবার ভেবেছি।

আমরা অনেক সময় ধরে নিই, এমন কাজ করতে পারে কেবল সেই মানুষ, যারা শুরু থেকেই চরমপন্থী। কিন্তু যদি তারা সাধারণ মানুষ হন? এমন মানুষ, যাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা কোনো ক্যাফেতে দেখা হতে পারে। যাঁরা আমাদের পাশে বসে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে পারেন।

একজন মানুষ কীভাবে বন্ধুদের প্রতি সদয়, পরিবারের প্রতি স্নেহশীল এবং মানবাধিকারে বিশ্বাসী হয়েও মেনে নিতে পারেন যে একটি শিশু এমন একটি সীমারেখা অতিক্রম করার কারণে নিহত হতে পারে, যে রেখাটি শিশুটি দেখতেই পায়নি? অন্য একজন মানুষের মানবিকতাকে যখন সহজেই উপেক্ষা করা যায়, তখন একজন মানুষের বিবেকের কী হয়?

চলচ্চিত্র দেখে ফিরেও গাজা থেকে ফিরতে পারিনি

চলচ্চিত্রটি দেখে বেরিয়ে আসার সময় আমার মধ্যে দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ক্ষোভ অনুভব করছিলাম। গাজায় কী ঘটেছে, তা জানতে আমি চলচ্চিত্রটি দেখতে যাইনি। আমি সেখানে ছিলাম। যথেষ্ট দেখেছি।

আমি গিয়েছিলাম বুঝতে, যারা এসব করেছে, তারা কীভাবে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। কীভাবে হত্যাকে ন্যায্য বলে মনে করে? কীভাবে নিজেদের বোঝায় যে তারা যা করছে, তা স্বাভাবিক? আর কেউ কেউ কীভাবে সেই কাজের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পায়?

হয়তো আমি অনুশোচনার কোনো চিহ্ন খুঁজছিলাম। আশা করেছিলাম, তাদের কেউ একজন বলবেন, শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পেরেছেন কী করেছেন—যদিও সেই উপলব্ধি আসতে অনেক দেরি হয়েছে। কিন্তু আমি যে উত্তর খুঁজছিলাম, তা পাইনি। বরং এমন কিছু প্রশ্ন নিয়ে ফিরেছি, যেগুলো আমাকে আরো বেশি আতঙ্কিত করেছে।

সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারিনি। মাদ্রিদের রাস্তায় পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় হেঁটেছি। পুরো পাঁচ ঘণ্টা। কোথায় ছিলাম, কোথায় যাচ্ছিলাম, তা বুঝতে পারছিলাম না। চারপাশের রাস্তাঘাটের দিকেও খুব একটা খেয়াল ছিল না। সামনে তাকিয়েও যেন কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না।

শুধু হেঁটে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মাদ্রিদকে দেখছিলাম না, দেখছিলাম গাজাকে। দেখছিলাম ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের সেই দিনগুলো, যখন মায়ের সঙ্গে গুলির মধ্যে দিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। জানতাম না, কোথায় যাব। দেখছিলাম দুর্ভিক্ষের দিনগুলো, যখন ভাগ করে খাওয়ার জন্য এক টুকরো রুটিও খুঁজে পাওয়া যেত না।

দেখছিলাম হাসপাতালগুলো, সেই শিশুদের, যাদের বাঁচাতে পারিনি। আর বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম সেই দিনে, যেদিন আমার পরিবারের বাড়িতে বোমা হামলা হয়েছিল। মনে পড়ছিল, সেদিন যাঁদের হারিয়েছি, তাদের কথা। সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু চলচ্চিত্রটিকে পেছনে ফেলে আসতে পারিনি। হয়তো আমার ভেতরের কোনো অংশ এখনো গাজাতেই রয়ে গেছে।

যা কিছু আমি ভুলতে পারি না

গাজা ছেড়ে আসার পর থেকেই আবার বাঁচতে শেখার চেষ্টা করছি। এখন বাইরে হাঁটতে গেলে গোলা এসে পড়ার ভয় নেই। খাবার কিনতে গিয়ে জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা নেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফিরে এসে দেখতে পারি, সেটি যেখানে রেখে গিয়েছিলাম, সেখানেই আছে। এগুলো খুবই সাধারণ বিষয়। অথচ এখনো নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, সত্যিই এমন স্বাভাবিক জীবন সম্ভব।

মাদ্রিদের রাস্তায় ওই পাঁচ ঘণ্টা হাঁটার পর বুঝতে পেরেছি, ইউরোপে আসার পর থেকে যে সত্যটি স্বীকার করতে চাইছিলাম না, তা হলো—আমি শুধু শরীরটাকে গাজা থেকে বের করে আনতে পেরেছি। সেখানে ঘটে যাওয়া সবকিছু থেকে মুক্ত হতে পারব কি না, জানি না। আর সত্যি বলতে, সবকিছু পেছনে ফেলে আসতে চাই কি না, সেটিও নিশ্চিত নই।

যাদের ভালোবেসেছি, তাদের কীভাবে ভুলে যাব? তাদের জীবন এভাবে শেষ হয়ে গেছে—এই সত্যের সঙ্গে কীভাবে আপস করব? আমি সিনেমা হলে গিয়েছিলাম, শুনতে চেয়েছিলাম, যারা আমাদের সঙ্গে এসব করেছে, তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড কীভাবে মনে রাখে। কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় আমার মনে পড়ছিল শুধু সেই সবকিছু, যা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।

কখনো মনে হয়, যদি পুরো একটি দিন তাদের কথা মনে না করে কাটিয়ে দিতে পারি, তাহলে যেন তাদের আরও কিছুটা হারিয়ে ফেলব। মনে হয়, এক দিনের জন্যও ভুলে যাওয়া মানে তাদের হারানোর আরেকটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া। আবার কখনো শুধু চাই, একটি রাত যেন তাদের মুখ না দেখে ঘুমাতে পারি। এই দুই অনুভূতির মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করব, জানি না। প্রতিদিনই তারা আমার সঙ্গে থাকে।

তিন বছর আগে, মাত্র একটি দিনে আমি পরিবারের ৪২ জন সদস্যকে হারিয়েছি। যিনি তাঁদের বাড়িতে বোমা ফেলেছিলেন, তিনি এরপর কী করেছিলেন, তা আমি জানি না। জানি না, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে বিয়ার পান করতে গিয়েছিলেন, স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন, নাকি সেদিন রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিলেন। আমি জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, সেদিনের পর থেকে আমি আর কোনো রাত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারিনি।

আমি বেঁচে ফিরেছি, গাজা ছেড়ে এসেছি। তারপরও সেই বাড়িটিকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে আছি—সেই বাড়ির ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে সঙ্গে নিয়ে। আমি সিনেমা হলে গিয়েছিলাম, শুনতে চেয়েছিলাম, যারা আমাদের সঙ্গে এসব করেছে, তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড কীভাবে মনে রাখে। কিন্তু ফিরে এসে মনে পড়ছিল শুধু সেই সবকিছু, যা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন