দুই দফা শক্তিশালী ভূমিকম্প

মিয়ানমারে সহস্রাধিক মৃত্যুর শঙ্কা

মিয়ানমারে সহস্রাধিক মৃত্যুর শঙ্কা

মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৪ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১৪৪ এবং আহত হয়েছে ৭৩২ জন। এ সংখ্যা হাজার ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন স্থানে ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে দেশটির ছয় রাজ্যে।

এদিকে এ ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ডেও। এতে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে। সেখানে আটকে পড়েছে আরো অনেকে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্যানুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটি শুক্রবার মিয়ানমারের সাগাইং শহরের ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আঘাত হানে। খবর আলজাজিরা, এপি, বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমসের।

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং বলেন, ভূমিকম্পের ঘটনায় ১৪৪ জন নিহত এবং ৭৩২ জন আহত হয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এর মধ্যে নেপিদোতে সবচেয়ে বেশি ৯৬ জন মারা গেছে। আর সাইগিংয়ে ১৮ জন এবং মান্দালয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের। আহতদের ১৩২ জন নেপিদোর এবং ৩০০ জন সাগাইংয়ের।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে অনুমান করছে, নিহত মানুষের সংখ্যা হাজার ছাড়াবে।

মিয়ানমার 2

এদিকে মিয়ানমারের ছয় রাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। টেলিগ্রামে জানানো হয়, দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে এবং মানবিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে।

ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালকে ‘ম্যাস ক্যাজুয়ালিটি এরিয়া’ ঘোষণা করা হয়েছে বলে এএফপি নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা। এক হাজার শয্যার হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের সামনে বহু আহতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের বাগো অঞ্চলের টাউংনু শহরের দুই প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, একটি মসজিদের আংশিক ধসেপড়ার কারণে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, মিয়ানমারের প্রাচীন রাজকীয় রাজধানী মান্দালয় শহরের রাস্তায় ধসেপড়া ভবন এবং ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।

হতেত নাইং ওও নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একটি চায়ের দোকান ধসে পড়েছে। যার মধ্যে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েছে। তাদের উদ্ধারে আমরা ভেতরে যেতেও পারছি না। অবস্থা খুবই জটিল আকার ধারণ করেছে।

28

মান্দালয়ের পার্শ্ববর্তী শান রাজ্যের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, যখন ভূমিকম্প আঘাত হানে তখন আমরা বাইরে ছিলাম। পরিস্থিতি এতই ভয়ংকর তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এ প্রত্যক্ষদর্শী বাস করেন একটি ক্যাম্পে। তিনি বলেন, মানুষের তৈরি দুর্যোগের পাশাপাশি এখন আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়েও ভীত। আমরা চারদিকে সাইরেনের শব্দ শুনেছি। জানি না, এ ভূমিকম্পের প্রভাব কতটা ভয়ংকর।

এদিকে ভূমিকম্পে ঐতিহাসিক মান্দালয় প্যালেস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি ১৮৫০-এর দশকে মিয়ানমারের রাজ পরিবার দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। পরে এটি ১৯৯০-এর দশকে সংস্কার করা হয়। মান্দালয়ে ইরাবতী নদীর ওপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত আভা সেতুও ধসে পড়েছে।

মান্দালয়ে উদ্ধারকাজে ব্যস্ত এক উদ্ধারকর্মী জানান, অত্যধিক মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহত মানুষের সংখ্যা অনেক। এখন পর্যন্ত এতটুকুই বলতে পারি। উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। কতজন মারা গেছে তা বলা যাচ্ছে না। তবে এ সংখ্যা শত শত হতে পারে।

ব্যাংককে আকাশচুম্বী ভবন ধস

Earthquake_6

এ ভূমিকম্পে থাইল্যান্ডের রাজধানীর ব্যাংককে যেসব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার বেশির ভাগই ছিল নির্মাণাধীন। দেশটির সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, ব্যাংককে যেসব ভবন ধ্বংস হয়েছে তার অধিকাংশই ছিল নির্মাণাধীন। সংশ্লিষ্টদের উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংককের নগর কর্তৃপক্ষ জানায়, আকাশচুম্বী একটিসহ তিনটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৬ জন। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে ১০১ জন।

নিরাপত্তা বিবেচনায় রাজধানীর গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। আলজাজিরার প্রতিনিধি ইমরান খান বলেন, মানুষ রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে। কোনো ট্রেন নড়াচড়া করছে না। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

থাই প্রধানমন্ত্রী পায়োংটার্ন সিনাওয়াত্রা দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। এ ছাড়া ব্যাংকককে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

Earthquake_3.width-800

চীনের সংবাদমাধ্যম জানায়, এ ভূমিকম্প চীনের ইয়ুনান ও সিচুয়ান প্রদেশেও অনুভূত হয়েছে। এতে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা রুইলির কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন নাগরিক আহত হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত ও কম্বোডিয়ায়ও এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

মিয়ানমারে ভূমিকম্প তুলনামূলক একটি সাধারণ ঘটনা। দেশটিতে ১৯৩০ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ৭ বা তারও বেশি মাত্রার ছয়টি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ২০১৬ সালে মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানী বাগানে ৬.৮ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে তিনজন নিহত হয়। এ সময় ওই এলাকার পর্যটনকেন্দ্রগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন