আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আমাজন বনে জলবায়ু সম্মেলন: বৈশ্বিক ঐক্যের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

আতিকুর রহমান নগরী

আমাজন বনে জলবায়ু সম্মেলন: বৈশ্বিক ঐক্যের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

জীবাশ্ম জ্বালানিতে সমৃদ্ধ আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত আগের সম্মেলনের পর এবার জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩০) বসছে ব্রাজিলের বেলেমে—আমাজন বনের হৃদয়ে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার অংশগ্রহণকারীকে এবার তীব্র আর্দ্র আবহাওয়া ও সীমিত অবকাঠামোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা হোটেল সংকট ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সম্মেলন বেলেমেই আয়োজনের ব্যাপারে অনড়। তার লক্ষ্য, অংশগ্রহণকারীরা যেন আমাজনের বাস্তবতা—বন, নদী এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা—নিজ চোখে দেখেন। গত আগস্টে লুলা বলেছিলেন, “ধনী দেশে সম্মেলন আয়োজন করা সহজ হতো, কিন্তু আমরা চাই মানুষ প্রকৃত পরিস্থিতি অনুভব করুক।”

বিজ্ঞাপন

আমাজন বন যুগের পর যুগ ধরে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এখন বন ধ্বংস, খনন, দূষণ, মাদক ব্যবসা এবং আদিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘনের মতো সমস্যায় জর্জরিত। এদিকে সম্মেলনের প্রস্তুতিও পিছিয়ে রয়েছে—অনেক প্রদর্শনী প্যাভিলিয়ন এখনো নির্মাণাধীন। জাতিসংঘের একটি সূত্র জানিয়েছে, “সময়মতো সব প্রস্তুতি শেষ হবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে—সংযোগ, সাউন্ড সিস্টেম, এমনকি খাবারের ব্যবস্থাও অনিশ্চিত।”

প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আসলে আলোচনায় কী অগ্রগতি হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, সাইক্লোন ও খরায় আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য সহায়তার অর্থ কোথা থেকে আসবে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। অক্টোবরের বিধ্বংসী হারিকেনে জ্যামাইকা ও ফিলিপাইনের টাইফুন বিপর্যয়ের উদাহরণ এখন আলোচনায়।

প্রেসিডেন্ট লুলা সম্প্রতি বিশ্বনেতাদের সামনে জীবাশ্ম জ্বালানি হ্রাসের একটি ‘রোডম্যাপ’ উপস্থাপন করেছেন, তবে এর বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। ২০২৩ সালের দুবাই সম্মেলনে বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তখন থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কপ-৩০ সম্মেলনের সভাপতি আন্দ্রে অরানহা কোরেয়া দো লাগো বলেছেন, “আমরা কীভাবে এগোব, আদৌ কি ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।”

১৯৯২ সালের রিও ডি জেনেরিও আর্থ সামিটে জাতিসংঘ জলবায়ু ফ্রেমওয়ার্কের সূচনা হয়, যার ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫–২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, ১.৫ ডিগ্রি সীমা শিগগিরই অতিক্রম করবে বিশ্ব, তাই এখনই পদক্ষেপ জরুরি।

ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জোট বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতাকে আলোচ্যসূচিতে রাখার আহ্বান জানিয়েছে। কপ সম্মেলনের কম উন্নত দেশগুলোর উপদেষ্টা মঞ্জীত ধকাল বলেন, “১.৫ ডিগ্রি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি টিকে থাকার সীমা।”

তবে এবারের সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব নেই—বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশটি প্রথমবারের মতো অনুপস্থিত। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একেবারে নীরব থাকেননি; তিনি এক সামাজিক মাধ্যম পোস্টে অভিযোগ করেছেন, বেলেমে নতুন রাস্তা তৈরির জন্য গাছ কাটা হচ্ছে এবং একে ‘স্ক্যান্ডাল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বেলেম সম্মেলন শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে না—এটি প্রমাণ করবে, পৃথিবী কি এখনও একসঙ্গে লড়াই করার সক্ষমতা রাখে।

তথ্যসূত্র: এএফপি

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন