হারেৎজ বলছে নিহত এক লাখ

গাজায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কত?

গাজায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কত?

গাজায় ইসরাইলের নৃশংস সামরিক আগ্রাসনে কমপক্ষে এক লাখ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যা গাজা উপত্যকার জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ। শুক্রবার সংবাদমাধ্যম হারেৎজের এক প্রতিদেনে এতথ্য জানানো হয়।

হারেৎজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মৃত্যুর সংখ্যার বিপরীত। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৫৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি।

বিজ্ঞাপন

হারেৎজ জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলায় উচ্চ ফিলিস্তিনি মৃত্যুর পাশাপাশি, গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফলে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব যেমন ক্ষুধা, ঠান্ডা এবং রোগেও অনেক মানুষ মারা গেছে।

গবেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে গাজায় মৃতের সংখ্যা সেখানে সংকটের প্রকৃত মাত্রাকে অবমূল্যান করে। ক্ষুধা, রোগ এবং খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে ইসরাইলি গুলিবর্ষণ উপত্যকার যুদ্ধকে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী করে তুলেছে।

গত সোমবার, গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনে নিহতদের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে। এক হাজার ২২৭ পৃষ্ঠারে এই তালিকায় নিহতদের নাম ও পরিচয় বয়সে সবচেয়ে ছোট থেকে বড় পর্যন্ত সাজানো হয়েছে। আরবি ভাষার নথিতে মৃত ব্যক্তির পুরো নাম, পিতা ও দাদার নাম, জন্ম তারিখ এবং পরিচয়পত্র নম্বর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পূর্ববর্তী তালিকার বিপরীতে, এই সংকলনে হামলায় নিহত এক বছরের কম বয়সী শিশুদের সঠিক বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। মাহমুদ আল-মারানাখসহ আরো সাত শিশু তাদের জন্মের দিনেই মারা যায়। পৃথিবীতে প্রবেশের পরের দিনই আরো চার শিশুকে হত্যা করে ইসরাইলি বাহিনী। অন্য পাঁচজন দুই দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল। ৪৮৬টি নামের পরে, ১১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, এমন কোন শিশুর নাম নেই যে ছয় মাসের বেশি বয়সী ছিল।

১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের নাম রয়েছে ৩৮১ পৃষ্ঠা জুড়ে। ৫৫ হাজার ২০২ জন নিহত ব্যক্তির মধ্যে ৯ হাজার ১২৬ জন নারী।

Gaza 6

ইসরাইলি মুখপাত্র, সাংবাদিক এবং প্রভাবশালীরা ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, এই প্রতিবেদন অতিরঞ্জিত। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তালিকাটি এর সমস্ত ভয়াবহতা সত্ত্বেও, কেবল নির্ভরযোগ্যই নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলওয়ে কলেজের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাটের গাজায় মৃত্যুর বিষয়ে পরিচালিত একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলোওয়ে কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাট সহিংস সংঘাতে মৃত্যুহারের উপর একজন বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ। তিনি ইরাক, সিরিয়া এবং কসোভো যুদ্ধ নিয়ে বহু নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি এবং গবেষকদের একটি দল গাজা উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যাপক গবেষণা প্রকাশ করেছেন।

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. খলিল শিকাকির সহায়তায়, দলটি গাজার দুই হাজার পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষ ছিল। তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, যুদ্ধের সময় গাজায় প্রায় ৭৫ হাজার ২০০ জন নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন। যার বেশিরভাগই ইসরাইলি হামলার কারণে হয়েছে।

জরিপের তথ্য অনুসারে, নিহতদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ হয় ১৮ বছর বয়সী শিশু অথবা নারী।

হারেৎজ বলছে, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রায় প্রতিটি সংঘাতের সঙ্গে তুলনা করলে এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিসংখ্যান।’

স্পাগাট বলেছেন, জরিপের তথ্য অনুযায়ী গাজা যুদ্ধ ‘২১ শতকের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোর মধ্যে একটি।’

তার মতে, যদিও সিরিয়া, ইউক্রেন এবং সুদানে যুদ্ধে নিহতদের সামগ্রিক সংখ্যা প্রতিটি ক্ষেত্রেই বেশি। তবুও গাজা স্পষ্টতই নিহতদের অনুপাতের দিক থেকে প্রথম স্থানে রয়েছে, সেইসাথে জনসংখ্যার আকারের তুলনায় মৃত্যুর হারের দিক থেকেও।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংস সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে আসছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।

গত নভেম্বরে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন