আরবরা শত্রু এবং ফিলিস্তিনের ভূমি ইহুদিদের—প্রশিক্ষণে মগজ ধোলাই হয় ইসরাইলি সেনাদের

আরবরা শত্রু এবং ফিলিস্তিনের ভূমি ইহুদিদের—প্রশিক্ষণে মগজ ধোলাই হয় ইসরাইলি সেনাদের

গাজায় নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, খাদ্য ও ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ, আবাসিক এলাকায় নির্বিচার হামলা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও কৃষিজমি ধ্বংসের অভিযোগ নতুন নয়। এসব ঘটনার অনেকগুলোর পক্ষে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন রয়েছে। এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা পরিচয়ে এক ব্যক্তির নামে ছড়িয়ে পড়েছে এসব নৃশংসতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা।

‘আমি আর নীরব থাকতে পারছি না’ শিরোনামের ওই বক্তব্যে আভদার শাইলোভস্কি নামে এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, পাঁচ বছর ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের পর ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে আর চাকরি চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি। পরে সেনাবাহিনী ছেড়ে পূর্বপুরুষদের দেশ পোল্যান্ডে চলে যান।

বিজ্ঞাপন

বক্তব্যে তিনি গাজায় দায়িত্ব পালনের সময় ট্যাংক থেকে তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের ওপর গোলাবর্ষণ, বেকারি ও ত্রাণকেন্দ্রের সামনে অপেক্ষমাণ লোকজনের ওপর হামলা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের মতো ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। সহকর্মীদের কাছে এসব ঘটনার প্রতিবাদ করায় তাকে কাপুরুষ বলা হতো বলেও দাবি করেছেন তিনি।

আভদার শাইলোভস্কির সামরিক পরিচয়, মেজর পদমর্যাদা এবং পোল্যান্ডে চলে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। পোল্যান্ডের একটি ওয়েবসাইটে ২৭ অক্টোবর বক্তব্যটি পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। সেখানে মূল সূত্র হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টের উল্লেখ রয়েছে। ফলে তার নামে প্রচারিত বক্তব্যটির ব্যক্তিগত সত্যতা নিশ্চিত না হলেও এতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিলে যায়—এমন বহু ঘটনার প্রমাণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে রয়েছে।

ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ

শাইলোভস্কির বক্তব্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগগুলোর একটি হলো, গাজায় খাদ্য ও ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর ইসরায়েলি সেনাদের গুলিবর্ষণ। তিনি দাবি করেছেন, ট্যাংক থেকে বেসামরিক মানুষের ভিড়ে গোলা ছোড়া হতো। কখনো বেকারির সামনে, কখনো খাদ্য ও ত্রাণবাহী গাড়ির পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর হামলা চালানো হতো।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রতিবেদনেও এ ধরনের ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) ২৭ মে খাদ্য বিতরণ শুরু করার পর ত্রাণ সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ ও গোলাবর্ষণে ৪১০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের ত্রাণবাহী গাড়ির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় আরো অন্তত ৯৩ জন নিহত হন। এসব ঘটনায় আহত হন অন্তত তিন হাজার ফিলিস্তিনি।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, খাদ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া মানুষের ওপর গুলি চালানো বন্ধ করতে হবে। সংস্থাটির মতে, বেআইনিভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও আহত করা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ২০২৫ সালের ১ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গাজায় ত্রাণ সংগ্রহ করতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের হত্যার ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে। সংস্থাটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পরিচালিত সামরিকীকৃত ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা নিয়মিত প্রাণঘাতী ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায় তারা।

অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ান ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানে গাজায় ত্রাণ নিতে গিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় নিহত ও আহত বেসামরিক মানুষের ঘটনাগুলো নিয়ে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করে। সেখানে স্যুপের রান্নাঘর, বেকারি, ত্রাণগুদাম, খাদ্যবাহী গাড়ির বহর, আকাশ থেকে ফেলা ত্রাণ এবং পানির জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর হামলার ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ত্রাণকর্মী ও মানবিক সহায়তাবহরও হামলার শিকার

গাজায় শুধু ত্রাণপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষই নন, আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার কর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৪ মে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ত্রাণকর্মীদের গাড়িবহর ও স্থাপনায় অন্তত আটটি হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব হামলায় অন্তত ৩১ জন ত্রাণকর্মী ও তাঁদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি নিহত বা আহত হন।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল দেইর আল-বালাহ এলাকায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের তিনটি গাড়িতে ইসরাইলি হামলার ঘটনাও তুলে ধরা হয়। ওই হামলায় সাতজন ত্রাণকর্মী নিহত হন। সংস্থাটি জানায়, হামলার আগে ত্রাণ সংস্থাটি তাদের গাড়িবহরের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল।

পশ্চিম তীরে জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা ও কৃষকদের ওপর হামলা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যে শাইলোভস্কি দাবি করেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের জলপাইগাছ উপড়ে ফেলতেন, কৃষকদের ওপর হামলা করতেন এবং তাদের জমিতে যেতে বাধা দিতেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আগের ১২ মাসে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ১ হাজার ৭৩২টি ঘটনা নথিভুক্ত করে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘর ও কৃষিজমির ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মধ্যে ৩৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও কৃষিজমি ধ্বংস, ভয়ভীতি দেখানো এবং জমি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। এসব সহিংসতা ঠেকাতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ।

চলতি বছরের জলপাই সংগ্রহের মৌসুমেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহে পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৬০টি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ)। অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনাদের উপস্থিতিতে বা তাদের অংশগ্রহণে এসব হামলা হয়েছে।

এ সময় জলপাইগাছ ধ্বংস, ফসল ও কৃষি সরঞ্জাম চুরি, কৃষকদের ওপর হামলা এবং জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ২ লাখ ৮৬ হাজার জলপাইগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ফিলিস্তিনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবের বরাত দিয়ে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

বাড়িঘর ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ

প্রচারিত বক্তব্যে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের সময় তাদের পরিবারের সদস্যদের ঘরের ভেতরে রেখেই অভিযান চালানোর অভিযোগও করেছেন ওই ব্যক্তি। এমনকি একজন ফিলিস্তিনিকে ছাদে উঠে সাদা কাপড় নাড়ানোর পরও গুলি করে হত্যার একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন তিনি।

ওই নির্দিষ্ট ঘটনার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া না গেলেও পশ্চিম তীরে বাড়িঘর ধ্বংস ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ব্যাপক চিত্র জাতিসংঘের প্রতিবেদনে রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বসতি সম্প্রসারণ, সহিংসতা এবং বাড়িঘর ও কৃষিজমি ধ্বংসের কারণে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তাদের বসতভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সংস্থাটি এ পরিস্থিতিকে অধিকৃত ভূখণ্ডজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির একটি সমন্বিত প্রবণতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

‘আমি আর নীরব থাকতে পারছি না’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের শেষাংশে শাইলোভস্কি দাবি করেছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতি অমানবিক আচরণ দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সহকর্মীদের কাছে এসব ঘটনার প্রতিবাদ করেও কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি। বরং তাকে দুর্বল ও কাপুরুষ বলে উপহাস করা হতো।

তিনি আরো দাবি করেন, ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে সেনাদের প্রশিক্ষিত করা হতো। তাদের শেখানো হতো, আরবরা শত্রু এবং ফিলিস্তিনের ভূমি ইহুদিদের। এসব ধারণা সেনাদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করত বলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় সেনাবাহিনী ছেড়ে পোল্যান্ডে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি করেছেন তিনি। ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো নির্যাতনের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন ওই ব্যক্তি।

তবে তার নামে প্রচারিত লেখায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার বিষয়ে ইসরাইলি নেতৃত্ব ও গোয়েন্দা সংস্থার আগাম জানার যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ দেওয়া হয়নি। একইভাবে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও সেনাবাহিনী ত্যাগের দাবিও এখনো নিশ্চিত নয়।

ফিলিস্তিনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন নথি রয়েছে

আভদার শাইলোভস্কি নামে প্রচারিত বক্তব্যটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, ত্রাণপ্রত্যাশীদের হত্যা, ত্রাণকর্মীদের ওপর আক্রমণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নথিতে রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর, ওসিএইচএ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনগুলোতে এসব ঘটনার বিবরণ ও পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের প্রতিটি ঘটনা ওই ব্যক্তির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কি না, তা নিশ্চিত না হলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যে বাস্তব এবং আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

মেজর আভদার শাইলোভস্কির বর্ণনা নিম্নে তুলে ধরা হলো-

‘‘আমি আর নীরব থাকতে পারছি না। আমি আভদার শাইলোভস্কি। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর একজন মেজর, আমি ইসরাইলি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছি।

আমি সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে ঘোষণা করছি যে, পাঁচ বছরের চাকরিজীবনে নিজের চোখে দেখা সমস্ত অপরাধের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা- এবং এভাবে নিজের মানবিকতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা-আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না বলেই আমি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ছেড়ে দিয়েছি।

আমি যা দেখেছি, তা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে না নিলে সেই ঘটনাগুলো আমাকে ভেতর থেকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলবে। আমার গভীর শোকের ভারে যেকোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হতে পারে।

তাই সত্য প্রকাশে আমাকে অবশ্যই কিছু অবদান রাখতে হবে। হয়তো এতে আমার অপরাধবোধ কিছুটা লাঘব হবে, আর হয়তো ঈশ্বর আমার সেই যন্ত্রণাও হালকা করবেন, যে যন্ত্রণা আমার জন্য ইহকাল ও পরকালে অপেক্ষা করছে!

ইসরাইলি বাহিনীর একজন সদস্য হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছি, নৃশংস ঘটনাবলী সংঘটিত করেছি, ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছি; তার জন্যে নিশ্চয়ই আমার ঈশ্বর আমাকে কঠিন শাস্তি দিবেন।

এভাবেই প্রচন্ড মানুসিক কষ্টে দিন কাটছিল। আর একদিন আমি স্বপ্নে একটি ঐশী ইঙ্গিত পেলাম: সবকিছু পেছনে ফেলে নিজের পথে চলে যাও। ঘুম ভেঙে যাবায়ার পর আমি অস্থির হয়ে পড়লাম এবং বললাম- হে ঈশ্বর, আমাকে পথ দেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

এল আলের বিমানটি ওয়ারশ বিমানবন্দরে অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি নিরাপদ বোধ করলাম- ইসরাইলের সেই ভূমি থেকে অনেক দূরে, যে ভূমি এখন আমার কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না।

আমাদের শেখানো হয়েছিল, এই ভূমি ঈশ্বর আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এটি এমন এক বিরাট মিথ্যা, যা ইহুদি জনগণকে প্রতারিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অব্যাহত মিথ্যা- যার মাধ্যমে গত আশি বছর ধরে নিরস্ত্র ও অসহায় ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আজও ঐ মানুষগুলোকে অকল্পনীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা, জঘন্যতা ও নৃশংসতা চালায়, তা বর্ণনা করার মতো শব্দ কোথায়? পৃথিবীর কোনও বই বা ডিকশনারিতে সেই শব্দ খুজে পাওয়া যাবেনা।

নেতানিয়াহু একটা চরম মিথ্যাবাদী, সে যা বলে, তা বিশ্বাস করেনা। সে একজন ঘৃণ্য মিথ্যাবাদী- বিশেষ করে যখন সে আইডিএফ-কে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী’ বলে বর্ণনা করে। বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত!

সত্য হলো, এটি বিশ্বের সবচেয়ে অধঃপতিত, নিষ্ঠুর ও বর্বর সেনাবাহিনী। হ্যাঁ, বিশ্ববাসী, ইসরাইল গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে, সেই বর্বরতার সাক্ষী হয়ে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।

আমি গাজায় দায়িত্ব পালন করেছি। নিজের চোখে দেখেছি, কীভাবে একজন ট্যাংক কমান্ডার তার ট্যাংকের কামান নিয়ে যেন খেলায় মেতে উঠতেন! তাঁবুর ভেতরে গাদাগাদি করে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের দিকে গোলা ছুড়তেন।

কখনো আবার বেকারির সামনে কিংবা খাদ্য ও ত্রাণ বিতরণকারী যানবাহনের পাশে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ওপর গোলাবর্ষণ করতেন! কি জঘন্যতা! অমানবিকতা!

আমি নিজের চোখে দেখেছি, কীভাবে বিমান থেকে জনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হতো, আর ভবনগুলো ধসে পড়ে তার ভেতরে থাকা মানুষদের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা দিত।

নিজের চোখে দেখেছি, দখলদার বাহিনীর স্নাইপাররা ত্রাণ পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও নারীদের গুলি করে হত্যা করে যেন নিজেদের বিনোদন খুঁজে নিত। ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা যেন এক উন্মাদনা!

আমি যেসব অপরাধের সাক্ষী হয়েছি, সেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটতে পারে না। এগুলো কেবল ফিলিস্তিনের মাটিতেই ঘটে। পৃথিবী দেখেও দেখে না। ইসরাইলকে কেউ কিচ্ছু বলেনা। ইসরাইল সকল অপরাধের ঊর্ধ্বে। এটা কি করে সম্ভব! মাননতা কোথায়? ফিলিস্তিনে এসে মানবতা হারিয়ে গেছে!

আমি নিজের চোখে দেখেছি, একটি শিশু রক্তে ভেজা বাসি রুটির টুকরো আঁকড়ে ধরে তার মায়ের মৃতদেহের পাশে কাঁদছে। আর সৈন্যরা তাকে দেখে হাসছে- যেন কোনো হাস্যরসাত্মক ভিডিও দেখছে। কী জঘন্য বর্বরতা!

তারা দাবি করে, এই মানুষগুলো মানুষ নয়; তারা আমাদের সমান নয়, আমরা ইহুদিরা যেমন, তারা তেমন নয়। আমি সাহস সঞ্চয় করে সহকর্মীদের বলতাম, “ভাই, ওরা যদি একদল বানরও হতো, তাহলেও কি আমরা এভাবে তাদের হত্যা করতে পারতাম?” তারা জবাব দিত, “তুমি কাপুরুষ, তুমি দুর্বল- তুমি ইহুদি হওয়ার যোগ্য নও।”

আমি দেখেছি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জলপাইগাছ উপড়ে ফেলতে, নিজেদের জমিতে কাজ করা কৃষকদের ওপর হামলা করতে, গুলি চালাতে। আমি তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করতে দেখেছি। বাড়ির মালিকদের তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, অথচ বাসিন্দারা ভেতরে থাকা অবস্থাতেই বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হতো।

আমি নিজ চোখে দেখেছি, একজন সৈন্য একজন ফিলিস্তিনিকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিল, “তুমি ছাদে উঠে যাও। নইলে তোমার পরিবারের সকল সদস্যরা ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থাতেই আমরা বাড়িটি ধ্বংস করে দেব- আর এর জন্য দায়ী থাকবে তুমি।”

লোকটি যখন ছাদে উঠে একটি সাদা কাপড় নাড়াতে শুরু করল, তখন ঐ ইসরাইলি সৈন্যটি তাকে সেখানেই গুলি করে হত্যা করল। কেউ কি এসব বিশ্বাস করতে পারে? এমন দৃশ্য কতটা মর্মান্তিক তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

ইসরাইলিদের এই নিষ্ঠুরতার কোনো ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাইনি- আমরা ইহুদি হিসেবে যেভাবে বেড়ে উঠেছি, তা ছাড়া। আমাদের শেখানো হয়েছিল, আরবরা নোংরা, বর্বর এবং চরমপন্থী মুসলিম হত্যাকারী। আরও শেখানো হয়েছিল, আমরা যদি তাদের প্রতি সদয় হই, তাহলে তারা আমাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে।

একবার ভাবুন তো, আমাদের কী ধরনের মগজধোলাই করা হয়েছিল!

আমাদের শেখানো হয়েছিল, ফিলিস্তিনের ভূমি আমাদের-ইহুদিদের। তারা দাবি করেছিল, গোলান মালভূমি এবং সমগ্র লেভান্ত অঞ্চল সিয়োনের সন্তানদের। আমাদের শেখানো হয়েছিল, ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ইউফ্রেটিস নদী থেকে নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই সমস্ত মিথ্যায় বিশ্বাস করার জন্য আমরা ইহুদিরা কতটা নিকৃষ্ট হতে পারি! আমরা যদি নিকৃষ্ট, নির্বোধ ও নৈতিকতাহীন না হতাম, তাহলে কখনোই এসব আদেশ পালন করতাম না। আমি আর এই নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে থাকতে পারছি না।

প্রতিরাতে আমি কাঁদতাম। আমার সহযোদ্ধারা আমাকে উপহাস করে কাপুরুষ বলত। তারা জোর দিয়ে বলত, একজন ইহুদির মধ্যে আরবদের হত্যা করার এবং প্রতিশ্রুত ভূমি থেকে তাদের নির্মূল করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিৎ।

আমি এমন একটি দিনের জন্য প্রার্থনা করি, যেদিন আরবরা জেগে উঠে বুঝতে পারবে যে, ইসরায়েল একটি অলীক ধারণা- একটি মিথ্যা-যার একদিন অবসান ঘটবেই।

একটা কথা না বললেই নয়- আরব নেতারা যদি অপরাধী নেতানিয়াহু ও তার চক্রের সঙ্গে আঁতাত না করতেন, তাহলে আমরা কখনোই এত অপরাধ ও নৃশংসতা সংঘটিত করতে পারতাম না।

হে প্রভু, নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আমরা যা কিছু করেছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। হে ঈশ্বর, আমরা যে নৃশংসতা চালিয়েছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করো।

মুসলমানরা যেমন বলে, তুমিই ‘পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। তাই আমি নিশ্চিত, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে। কারণ, পথ হারিয়ে ফেলার পর অবশেষে আমি আমার সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছি।

হে ঈশ্বর, আমাকে সরল পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ- সেই সত্য, ভালোবাসা ও শান্তির পথ, যা অপরাধী ইসরায়েল রাষ্ট্রের পথ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’’

সূত্র: পোল্যান্ডের স্লোনেচনি স্টক, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ান, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...