ইসরাইলকে ভোট দিয়েছে ইসরাইলিরা, ব্যালটে কেন ছিল না গাজা

ইসরাইলকে ভোট দিয়েছে ইসরাইলিরা, ব্যালটে কেন ছিল না গাজা
ছবি: এপি

ইসরাইলের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বেশি ভোটার উপস্থিতির নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট কিংবা নিজেদের জায়নবাদী বিরোধী জোট হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রতিপক্ষ—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেয়ে সবার ওপরে রয়েছে। প্রধান বিরোধী জোটের চেয়ে তারা পাঁচটি আসন বেশি পেয়েছে। অন্যদিকে আরব দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন পেলেও সরকার গঠনের আলোচনা থেকে কার্যত বাইরে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দূর থেকে দেখলে নির্বাচনের ফল বিস্ময়কর মনে হতে পারে। ২০২২ সালে নেতানিয়াহুর সরকারের মেয়াদের শুরুতে বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর প্রতিবাদে ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়। ২০১৯ সাল থেকে দুর্নীতির মামলায়ও বিচারের মুখোমুখি রয়েছেন নেতানিয়াহু।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার আগে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার অভিযোগও এখনো খতিয়ে দেখা হয়নি। ওই হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু হয়। এ নিয়ে তদন্তের দাবিতে জনমত জোরালো হলেও সরকার এখনো এর জবাব দেয়নি।

এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এ যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে একাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানে চালানো হামলার প্রভাব এখনো বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।

এসবের পরও মঙ্গলবার প্রায় ২৩ লাখ ৮০ হাজার ইসরাইলি নেতানিয়াহুর জোটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এ জোটের নেতৃত্বে রয়েছে তার দল লিকুদ। অন্যদিকে বিরোধী জোটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন প্রায় ২২ লাখ ১০ হাজার মানুষ।

নির্বাচনে দুই জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে আলোচনার তেমন সুযোগ ছিল না। গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭৪ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। উপত্যকার বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বেড়েছে। এসব ঘটনায় ইসরাইল সরকারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সোমবার জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে ইসরাইল মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ।

নির্বাচনে গাজা কেন ইস্যু হলো না

বিশ্লেষকদের মতে, মঙ্গলবারের নির্বাচনে গাজা কিংবা পশ্চিম তীর ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেনি। এর প্রধান কারণ, এ দুটি বিষয়ে দুই জোটের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই।

নির্বাচনে বরং গুরুত্ব পেয়েছে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি বিষয়। এর মধ্যে ছিল আদালতের ক্ষমতা, অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে কি না এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলার আগে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার অভিযোগে সরকারের ভূমিকা তদন্ত করা হবে কি না।

ইসরাইলের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, রাজনীতিকেরা যেভাবে এসব নীতির পক্ষে কথা বলেছেন, ভোটারদের কাছেও বিষয়গুলো প্রায় একইভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, সমস্যাটি শুধু মানুষের তথ্য না জানা বা আগ্রহের অভাব। অনেক ইসরাইলি জানেন, গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে। যদিও তারা ওই ধ্বংসযজ্ঞের খুব বাছাই করা চিত্রই দেখতে পান। কিন্তু কোনো কিছু জানা আর তার নৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়।’

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক দুর্ভোগের খবর প্রকাশিত হলেও অনেক ইসরাইলির মধ্যে সহানুভূতির অভাব কেন, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।

শেনহাভ-শাহরাবানি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ, যারা পরিবারকে ভালোবাসেন, বন্ধুদের যত্ন নেন এবং নিজেদের ভালো মানুষ বলে মনে করেন, তারাও এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারেন বা সেটিকে মেনে নিতে পারেন, যা অন্যদের জন্য বিপুল দুর্ভোগ তৈরি করে।’

তার মতে, এ ক্ষেত্রে ‘অস্বীকারের একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া’ কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘এটি সব সময় তথ্য অস্বীকার করার বিষয় নয়, বরং তথ্যের অর্থ ও তাৎপর্য অস্বীকার করার বিষয়।’

নিরাপত্তাই ছিল ভোটের বড় বিষয়

তবে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো ব্যক্তিগত বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

ইসরাইলবিষয়ক বিশ্লেষক অ্যারন ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর সমর্থকদের কাছে লিকুদ একটি গোষ্ঠী, এমনকি একধরনের অনুসারীসমাজও। তাদের কাছে ‘প্রিয় নেতা’ সব সময় সঠিক। তার সমর্থকেরা প্রায় ১৯ বছর ধরে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করেছেন। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির মোট অস্তিত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন।

লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ব্রেগম্যান বলেন, ‘তাদের কাছে আরবদের পর শত্রু হলো বামপন্থিরা। নেতানিয়াহুর যত ত্রুটিই থাকুক, তারা তাকেই ভোট দেবেন।’

এই ভোটারদের বড় অংশের কাছে নির্বাচনটি সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন ছিল না। বরং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের দাবির মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার বিষয় ছিল। ইসরাইলি শিক্ষাবিদ রোই জুরের ভাষায়, এটি ছিল ‘গণতন্ত্রের হৃদয় ও আত্মা’ এবং ইহুদি ও ইসরাইলি পরিচয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই।

এস্যেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ভোটার আচরণ বিশেষজ্ঞ জুর বলেন, ‘নেতানিয়াহুর সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই ধারণা বা বিশ্বাস যে বিকল্প জোটটি নিরাপত্তার প্রশ্নে দুর্বল হবে।’

তার মতে, নেতানিয়াহু সফলভাবে এমন একটি ভীতির প্রচার চালিয়েছেন, যার ফলে অনেক ভোটার মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা শুধু তারই রয়েছে। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু এমন ধারণা তৈরি করতে পেরেছেন যে সাম্প্রতিক সময়ের সংকট এবং ৭ অক্টোবরের পরের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শক্তিশালী নেতা আর কেউ নেই।

শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, নির্বাচনে যুদ্ধ ও দখলদারত্ব কোনো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং কয়েক দশক ধরে এসব বিষয়ই ইসরাইলিদের কাছে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং গণতন্ত্রের অর্থ বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ‘এ কারণেই নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাতে গভীরতর সমস্যার সমাধান হবে না।’

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন