সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদন করেছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। এ চুক্তির আওতায় কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ কোনো সদস্যদেশের ওপর হামলাকে অন্য সদস্যদেশগুলোর নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তি কার্যকর হলে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি তুরস্কও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হবে।
বৃহস্পতিবার তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদিত হয়। এমন সময়ে এ অনুমোদন এল, যখন ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে রয়েছে সৌদি আরব।
গত আগস্টে তুরস্ক প্রথমবারের মতো ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে স্বাক্ষর করে। এরপর গত মাসে এটি অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে পাঠানো হয়। বুধবার চুক্তি অনুমোদনের জন্য আনা বিলের প্রথম অনুচ্ছেদ গ্রহণ করেন আইনপ্রণেতারা। তবে এরপর পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার জেলাল আদান অধিবেশন মুলতবি করেন।
আনাদোলু সংবাদ সংস্থার খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে অধিবেশন আবার শুরু হলে চুক্তির বাকি অনুচ্ছেদগুলো নিয়ে আলোচনা করেন আইনপ্রণেতারা। শেষ পর্যন্ত ২৭৯ ভোটে চুক্তিটি অনুমোদিত হয়। বিপক্ষে ভোট পড়ে ১১৯টি। পার্লামেন্টের ৫৯২ সদস্যের মধ্যে ভোটে অংশ নেন ৩৯৮ জন।
রয়টার্সের দেখা তুরস্কের পার্লামেন্টে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, চুক্তিতে মোট ১৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সদস্যদেশগুলোর কোনো একটির ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর হুমকি তৈরি হলে তা দূর করতে অন্য দেশগুলো ‘সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে। কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে এই অনুচ্ছেদ কার্যকর করা যাবে।
প্রথম অনুচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার পর কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশ অন্য কোনো দেশ বা কয়েকটি দেশের সশস্ত্র হামলা কিংবা সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে বাকি সদস্যদেশগুলো অবিলম্বে আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করবে। পারস্পরিক সহযোগিতার আওতায় থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হবে।
চুক্তির এই গুরুত্বপূর্ণ ধারা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন উত্তর আটলান্টিক চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ন্যাটোর ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জোটের কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যদেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তুরস্ক একই সঙ্গে ন্যাটো ও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের আশঙ্কা, দুই জোটের মধ্যে কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে সামরিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুরস্কের সরকার জটিলতায় পড়তে পারে। তবে তুরস্কের কর্মকর্তারা এ ধরনের আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
চুক্তির অন্য অনুচ্ছেদগুলোতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং সামরিক সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা। এ জন্য যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং রসদ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে একমত হয়েছে দেশগুলো।
তুরস্কের আইনপ্রণেতাদের অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী, চুক্তিতে অংশ নেওয়া দেশগুলো ১০ বছর এর সদস্য থাকবে। এরপর চাইলে কোনো দেশ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সদস্যদেশগুলোর সম্মতি নিয়ে নতুন দেশকে চুক্তিতে যুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। সিরিয়ার সরকার ইতোমধ্যে এ চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে পার্লামেন্টে চুক্তি অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে হুথিদের হামলার মুখে সৌদি আরবে তুরস্কের সেনা মোতায়েন নিশ্চিত হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুরস্কের সেনা পাঠাতে হলে এ অনুমোদনের বাইরে আরো কিছু আইনগত ও সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের গত অক্টোবরে বলেছিলেন, চুক্তি অনুমোদনের পর সৌদি আরবকে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তার পরিধি নির্ধারণ করা হবে।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যমের বরাতে গুলের বলেন, ‘হুথিদের সঙ্গে কোনো সংঘাতে জড়ানোর বিষয়টি আমরা একেবারেই বিবেচনা করছি না।’
তার ভাষায়, সৌদি আরবকে তুরস্কের সম্ভাব্য সহায়তার উদ্দেশ্য হবে দেশটির প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করা।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমেছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবে হামলা বাড়িয়েছে হুথিরা। বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে তারা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ঘিরেও অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সংঘাত সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা মদিনা অঞ্চলে একটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এর আগে রিয়াদ একাধিকবার অভিযোগ করেছে, হুথিরা ইসলামের পবিত্র দুই শহর মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

