বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত বঙ্গভবনে আসীন হয়েছেন এক শুভ্র, মার্জিত ও সজ্জন ব্যক্তিত্বÑরাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ বছর ২১ আগস্ট একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওই মনোরম সন্ধ্যায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি সংসদ ভবনে উৎসবমুখর এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটযুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার এই নির্বাচন কেবল সংখ্যার অঙ্কে বা সর্বোচ্চ ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ের গল্প নয়, এটি মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচ্ছন্ন ইমেজের এক নেতার দীর্ঘ কয়েক দশকের অবিচল সংগ্রাম এবং ত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ১১২টি রাজনৈতিক মামলার খড়্গ, ১১ বারের অন্ধকার কারাজীবন আর প্রিয়তমা স্ত্রীর অস্ত্রোপচারের মুহূর্তেও বন্দিশালার নির্মমতা এক বুক ধৈর্য সয়ে নেওয়া এই মানুষটি আজ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক হাতে রাজনৈতিক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দলের হাল ধরেছেন, অন্য হাতে নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে আওড়েছেন রবীন্দ্র-নজরুল, জীবনানন্দের কবিতা, কিংবা খালেদা জিয়া ও নেলসন ম্যান্ডেলার দর্শন। পহেলা বৈশাখের মঞ্চে নজরুলের দ্রোহ কিংবা নেত্রীর চিরবিদায়ে আল মাহমুদের কবিতার পঙ্ক্তিতে অশ্রু-ঝরানো এইকবিহৃদয়ের পণ্ডিত ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে বেছে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেবল সময়ের এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই দেননি, বরং দেশবাসীর সামনে প্রমাণ করেছেন—রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত সততা ও পরম ত্যাগের মহিমান্বিত জয় হয়।
মির্জা ফখরুলের উপস্থিতিতে বঙ্গভবন আজ এক অন্যরকম আলোয় উদ্ভাসিত, যা দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের চাওয়া ও আকাঙ্ক্ষার এক পরম প্রতিফলন।
সরকারি দল বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণার পর ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় প্রেস ক্লাব সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ও আমি তার হেয়ার রোডের বাসায় গিয়েছিলাম। আমাদের ড্রয়িংরুমে বসার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি সবুজ চত্বরে দিনকাল অনলাইনকে একটি সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। সেখান থেকে তিনি ড্রয়িংরুমে এসে আমাদের মিষ্টিমুখ করান এবং প্রায় একঘণ্টা নানা বিষয়ে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন। ড্রয়িংরুমের দেয়ালে শোভা পাচ্ছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করা অবস্থার একটি সুন্দর ছবি। তিনি বিএনপিতে যোগদান, দলের মহাসচিব হওয়া, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন, জেল-জুলুম, তার সাহিত্য ও বই পড়ার প্রতি অনুরাগ এবং জিয়া পরিবারের প্রতি ভালোবাসার কথা তিনি বলছিলেন।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে পরাজিত করেন, যিনি ৮৮ ভোট পেয়েছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এটিই ছিল প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় যোগ করেছে। এর আগে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে সব রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছিলেন। জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৪৩ জন সদস্য তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বাকি ছয়জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন নির্বাচনে রিটানিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যালট বাক্স ও স্বচ্ছ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে এই প্রকাশ্য ভোট গণনা সম্পন্ন হয়।
যেভাবে গ্রহণ করেছে মানুষ
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ জনগণ অত্যন্ত ইতিবাচক ও সানন্দচিত্রে গ্রহণ করেছে। ফলাফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে একটি লাল গোলাপ দিয়ে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তাকে আলিঙ্গন করে অভিনন্দিত করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ড. অলি আহমদ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে তাকে অভিনন্দন জানান। এ ঘটনা সংসদে এক বিরল সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ মির্জা ফখরুলকে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে এই সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন।
রাজনীতিতে অসাধারণ ভূমিকা ও ত্যাগ
আগেই বলেছি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ এবং একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবন ও দলের জন্য ত্যাগ অতুলনীয়। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত (২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে) তিনি বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সফলভাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলেন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। রাজনীতিতে পুরোদস্তুর নামার আগে তিনি ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি চরম রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হন। তার বিরুদ্ধে ১১২টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তাকে ১১ বার কারাগারে যেতে হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একটি গুরুতর অপারেশনের জন্য হাসপাতালে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। স্ত্রীর অস্ত্রোপচারের পুরো সময়টা তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছিল, যা তার জীবনের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত ত্যাগের উদাহরণ। কঠিন সময়েও ধৈর্য, মার্জিত ভাষা ও দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার এই যাত্রা বাংলাদেশের সংসদীয় ও সাংবিধানিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে দেখেছেন তাকে
১৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে বাছাইয়ের পেছনে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদান ও ত্যাগের কথা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দলের সবচেয়ে কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে মির্জা ফখরুল অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বিএনপির হাল ধরেছেন এবং শত নির্যাতন সত্ত্বেও কখনো দল ছেড়ে যাননি।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং বারবার কারাবরণ করেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন করার মাধ্যমে তাকে সেই ত্যাগের প্রকৃত সম্মান দেওয়া হয়েছে।
সংসদীয় দলের সভায় তারেক রহমান আবেগঘনভাবে উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের দমনপীড়নের সময় যখন মির্জা ফখরুল বারবার জেলে যাচ্ছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত তখন আমাকে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল। তাই এই সিনিয়র নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করি।
মির্জা ফখরুলের মতো একজন মার্জিত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করায় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গেও সরকারের একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পথ সুগম হয়েছে। মানুষ অতীতের ‘পুতুল নাচ’ মার্কা রাষ্ট্রপতির ভূমিকার বাইরে গিয়ে একজন সত্যিকার অভিভাবক হিসেবে তাকে দেখতে পেয়ে তারেক রহমানের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়াকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং দলীয় আস্থার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন। রাষ্ট্রপতি পদে ভোটে নির্বাচিত হওয়া এবং শপথের পর তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়াকে তিনি কোনো ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে না দেখে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও আন্দোলনের ফসল হিসেবে দেখছেন।
১১ বার জেলে বন্দি, ১১২টি মামলা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার রাজনৈতিক জীবনে মোট ১১ বার কারাগারে গেছেন এবং তার বিরুদ্ধে ১১২টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব মামলার কারণে তিনি সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর বা তারও বেশি সময় কারাবন্দি জীবন কাটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে এমন কিছু হাস্যকর, অবাস্তব এবং বানোয়াট অভিযোগ ছিল, যা দেশের রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও সাবেক এই মন্ত্রীকে একটি সাধারণ ময়লার গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় আসামি করা হয়েছিল। তার মতো একজন প্রবীণ ও সজ্জন ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ অপরাধীদের মতো মাঠে দাঁড়িয়ে সরাসরি বোমা বা ককটেল নিক্ষেপ করার হাস্যকর অভিযোগ আনা হয়। রাজনৈতিক সমাবেশের সহিংসতার অজুহাতে ঢাকা কলেজের সাবেক এই প্রথিতযশা শিক্ষককে পুলিশের ওয়াকিটকি সেট ও সরকারি অস্ত্র ছিনতাইয়ের মতো উদ্ভট অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় গাড়ি বা বাস ভাঙচুরের ঘটনায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও হুকুমের আসামি বা সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে ডজন ডজন মামলা দেওয়া হয়।
বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক দমনপীড়নের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি চরম অসৌজন্যমূলক, আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক আচরণ করা হয়েছিল।
২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বরের ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। আগের দিন নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে মির্জা ফখরুল তার নিজের কার্যালয়ে ঢুকতে গেলে পুলিশ সদস্যরা তাকে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। একজন প্রবীণ জাতীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ কর্মকর্তারা অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় তাকে বলেন, ‘ভেতরে যাওয়া যাবে না, ওপরের নির্দেশ আছে।’
আদালতে আনা-নেওয়ার সময় সাধারণ কয়েদিদের মতো তাকে ঘিঞ্জি ও নোংরা প্রিজন ভ্যানে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখা হতো। তার শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের কথা বিবেচনা না করে অনেক সময় দীর্ঘ পথ দাঁড় করিয়ে রাখা বা টানাহেঁচড়া করার মতো অসৌজন্যমূলক আচরণ করত পুলিশ।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ঘোষিত ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’। ওই দিন দুপুরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে তিনি যখন বের হতে যান, তখন দেখা যায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব এবং সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য চারপাশ থেকে প্রেস ক্লাব কর্ডন এবং অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ক্লাবের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে সংঘর্ষ এড়াতে মির্জা ফখরুল ওই রাতে প্রেস ক্লাব ভবন থেকে বের হননি। ক্লাবের একটি সাধারণ কক্ষে অত্যন্ত প্রতিকূল ও অস্বস্তিকর পরিবেশে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও বিশ্রামের পর্যাপ্ত সুবিধা ছাড়াই তিনি পুরো রাত কাটাতে বাধ্য হন। পরদিন ৬ জানুয়ারি দুপুরের দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রেস ক্লাব থেকে বের হয়ে নিজের গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করেন। তিনি গাড়িতে বসামাত্রই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা চারপাশ থেকে গাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং তাকে গাড়ি থেকে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি গাড়ি থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ অত্যন্ত অসৌজন্যমূলকভাবে গাড়ির দরজা টেনে খোলে এবং তাকে জোরপূর্বক ও টানাহেঁচড়া করে নামিয়ে আনে। তার বয়স ও রাজনৈতিক মর্যাদার তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় কথা বলে তাকে পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে তুলে সরাসরি মিন্টো রোডের ডিবি (গোয়েন্দা) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
জাতীয় প্রেস ক্লাবকে সাংবাদিকদের দ্বিতীয় বাড়ি এবং একটি নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে পুলিশি অবরোধ তৈরি করা এবং গেট থেকে একজন প্রবীণ নেতাকে টেনেহিঁচড়ে গ্রেপ্তার করা ক্লাবের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় ছিল। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে ঘাড়ের ইন্টারনাল ক্যারোটিড আর্টারি (Internal Carotid Artery) ব্লকেজ, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। রাজনৈতিক জীবনে বারবার দীর্ঘমেয়াদি কারাবরণ, কারাগারে চিকিৎসার অভাব এবং প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে তার এই স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগমকে জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা এবং ত্যাগের প্রতীক হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তাদের বৈবাহিক জীবনে স্ত্রীর অবদান সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ কথা বলেছেন। মির্জা ফখরুল স্পষ্ট করে বলেছেন, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংসারের কোনো দায়িত্ব তিনি পালন করতে পারেননি। তিনি মূল্যায়ন করেন, ‘আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রী যেভাবে সন্তানদের আগলে রেখেছেন, সংসার চালিয়েছেন এবং একা একা সব ঝড়ঝাপটা সামলেছেন, তা অতুলনীয়। তিনি না থাকলে আমি কখনো দেশের জন্য বা দলের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারতাম না।’ তিনি তার স্ত্রীকে রাজনীতির পেছনের একজন ‘নীরব যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাহিত্যহীন রাজনীতি রুক্ষ ও বিপজ্জনক
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন বিরল প্রজ্ঞাবান ও পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব, যিনি তার রাজনৈতিক বক্তব্যের গভীরে সাহিত্য, দর্শন ও বিশ্বখ্যাত বইয়ের উদ্ধৃতি ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করা সাবেক এই শিক্ষক বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। তিনি শুধু কবিতা আবৃত্তি করতেই ভালোবাসেন না, বরং জীবনের কঠিনতম সময়েও সাহিত্যকে তার আত্মিক শক্তির উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
মির্জা ফখরুল তার মার্জিত ভাষা ও শান্ত স্বভাবের জন্য সুপরিচিত। রাজনৈতিক জনসভা কিংবা সংবাদ সম্মেলনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি প্রায়ই জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, কিংবা সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা আবৃত্তি করে বক্তব্য দেন। তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন, কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে তার একমাত্র সঙ্গী ছিল বই ও কবিতা। জেলে বসে তিনি নিজে ডায়েরি লিখতেন এবং প্রিয় কবিদের কবিতা আবৃত্তি করে সময় কাটাতেন।
তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, ‘রাজনীতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, আর সাহিত্য মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখায়। সাহিত্যহীন রাজনীতি রুক্ষ এবং বিপজ্জনক।’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি প্রায়ই ম্যান্ডেলার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ বই উদ্ধৃত করে বলেন, ‘একটি বড় পাহাড় আরোহণের পর মানুষ কেবল এটাই আবিষ্কার করে যে, আরোহণের জন্য আরো অনেক পাহাড় বাকি রয়েছে। আমাদের লড়াইও ঠিক তেমনি—এক স্বৈরাচারের পতনই শেষ নয়, প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য আমাদের পথচলা দীর্ঘ।’
কারাগারে বসে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশির লেখা ‘প্রিজন নোট বুকস’ বইটির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন—‘আমার মন সবসময় নৈরাশ্যবাদী (Pessimism of the intellect); কিন্তু আমার ইচ্ছা বা চেতনা সবসময়ই আশাবাদী (Optimism of the will)।’
বাংলার সংকটময় মুহূর্তে তিনি প্রায়ই জীবনানন্দ দাশের কবিতার আশ্রয় নেন। একটি বড় জনসভায় দেশের মানুষের কষ্ট বোঝাতে তিনি আবৃত্তি করেছিলেন—‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা, যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, পৃথিবীর অচল শোরগোল ছাড়া, মানুষের মন আজ অবহেলা আর অবক্ষয়ের চাদরে ঢাকা।’
বিগত সরকারের তীব্র দমনপীড়নের মুখে নিজের এবং দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতে তিনি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করতেন, ‘বিপদের মেঘ আসুক; কিন্তু হে ঈশ্বর, বিপদে যেন আমি ভয় না পাই। তোমার শক্তির ওপর যেন আমার আস্থা অবিচল থাকে।’
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে, ‘গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার উৎসব নয়। গণতন্ত্র হলো মধ্যরাতে ঘরের দরজায় নক না পড়ার নিশ্চয়তা এবং স্বাধীনতার নিজের মতো প্রকাশ করতে পারা।’
মির্জা ফখরুলের চোখে জিয়াউর রহমান
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আধুনিক বাংলাদেশের দূরদর্শী স্থপতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। একদলীয় বাকশাল শাসনের অবসান ঘটিয়ে জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের অবদানকে তিনি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাঁক বদল মনে করেন। এ প্রসঙ্গে তার বিখ্যাত মন্তব্য—‘শহীদ জিয়া কেবল একটি দল গঠন করেননি, তিনি মূলত বাংলাদেশের মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে পুনর্জীবন দিয়েছিলেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং সব মত ও পথের মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তিনিই প্রকৃত গণতন্ত্রের রক্ষক।’
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক বিপ্লব (খাল খনন, তৈরি পোশাকশিল্প ও জনশক্তি রপ্তানির সূচনা) নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে আমরা যে স্বাবলম্বী ও আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তার সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে ভিক্ষুকের কুণ্ঠা ঝেড়ে ফেলে আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হয়।’
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা এবং সাধারণ জীবনযাপনকে মির্জা ফখরুল বর্তমান তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয় বলে মনে করেন। তিনি প্রায়ই তার ভাষণে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকেও যিনি ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙা সুটকেস রেখে গেছেন, তার সেই সততা ও সাদামাটা জীবন দর্শনই প্রমাণ করে, তিনি ক্ষমতার লোভী ছিলেন না, তিনি ছিলেন জনগণের সত্যিকারের সেবক। বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু রাজনীতির বাজারে জিয়াউর রহমানের এই সততা আজ সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।’
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মির্জা ফখরুল মন্তব্য করেছিলেন, ‘৭ নভেম্বর কোনো সাধারণ দিন নয়। সেদিন দেশের সিপাহি এবং জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে দেশের শাসনভার সমর্পণ করেছিল। জিয়া কোনো পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসেননি, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জনগণই তাকে ক্ষমতার চেয়ারে আসীন করেছিল।’
প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের দিনে বিএনপির পক্ষ থেকে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। বেগম খালেদা জিয়া অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত থাকতেন এবং দলের নেতাকর্মী ও শিল্পীরা সেখানে গান ও কবিতা পরিবেশন করতেন।
এমন একটি অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহ ও আশাবাদের কবিতা (যেমন ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’) অত্যন্ত চমৎকার কণ্ঠে আবৃত্তি করেন। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন পরিশীলিত ও অনুপ্রেরণামূলক আবৃত্তি শুনে স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়া এবং উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে, উৎসবের আমেজকেও তিনি সাহিত্যের ছোঁয়ায় কতখানি অর্থবহ করে তুলতে পারেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আয়োজিত একটি অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও আবেগঘন শোকসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কবি আল মাহমুদের বিখ্যাত ‘খালেদা’ কবিতাটি আবৃত্তি করে উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত করেছিলেন। কবি আল মাহমুদ তার এই কবিতায় বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম, আপসহীন নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসাকে সাহিত্যের তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
শোকসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল যখন তার গম্ভীর ও বিষণ্ণ কণ্ঠে কবিতার চরণগুলো উচ্চারণ করছিলেন, তখন তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছিল। তিনি কবিতার এই অংশগুলো অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন—‘তুমি তো একাকী নও, হে নারী, তোমার সঙ্গে আছে কোটি মানুষের ভালোবাসা... তুমি এই বাংলার ধুলোবালি আর ঘাসের বুকে মিশে থাকা এক অবিচল নাম।’ এমন একজন রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বঙ্গভবন আলোকিত হোক, দেশ আলোকিত হোক।
লেখক: সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


