আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বেকায়দায় মোদি

আল আসাদ

ইরান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বেকায়দায় মোদি
বামে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ডানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত।

প্রায় এক মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে অবহিত কর্মকর্তাদের মতে, ইসলামাবাদ যুদ্ধ অবসানে আমেরিকার দেওয়া ১৫ দফা পরিকল্পনা তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, একই সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রস্তাবও দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনা পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারতের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা পাকিস্তান যেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন চলছে, যা নয়াদিল্লি সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে এ সংবাদ প্রকাশের পর মোদি নিজ দেশে বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েন।

লন্ডনভিত্তিক দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির গত রোববার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এবং আলোচনা করার জন্য ইসলামাবাদকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে তুলে ধরেন। এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেন।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ও ইরানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আলোচনাগুলো এ সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে।

বিশ্ব কূটনীতিতে পাকিস্তানের উদীয়মান ভূমিকার খবরের প্রেক্ষাপটে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নরেন্দ্র মোদির শাসনে ভারতের বিদেশনীতিকে ‘রসিকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

রাহুল গান্ধী বলেন, আমাদের বিদেশনীতি হলো প্রধানমন্ত্রী মোদির ব্যক্তিগত বিদেশনীতি। এর ফলাফল আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। এটি একটি বিশ্বজনীন কৌতুকে পরিণত হয়েছে।

যেদিন পাকিস্তানের এ কূটনৈতিক উদ্যোগের সংবাদ প্রকাশিত হয়, সেদিনই নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঘোষণা করেন, ট্রাম্প ও মোদির মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। তবে সে আলাপের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য উভয় নেতা যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে ভারতসহ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নয়াদিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকব বলেন, সাধারণত জাতিসংঘ কিংবা কাতারের মতো দেশ এ ধরনের মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ট্রাম্প বরাবরই জাতিসংঘের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে এড়িয়ে চলেন আর ইরান কাতারে হামলা চালাচ্ছে—এ বাস্তবতায় ভিন্ন কোনো পথ খোঁজা প্রয়োজন।

অবশ্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে। ইরানের সঙ্গে দেশটির একটি বড় সীমান্ত, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরব ও চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কই তাকে এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সহায়তা করেছে।

গত বছর পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহতের পর ভারত-পাকিস্তান যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, সে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ থামানোর দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। সংঘর্ষ বন্ধের পর ইসলামাবাদ অতি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপকে শান্তি স্থাপনের কারণ হিসেবে স্বীকার করে। কিন্তু ভারত অনেকটা নীরব থাকার পন্থা অবলম্বন করে, যা ট্রাম্প ভালোভাবে নেননি। এরপর পাকিস্তানের নেতাদের ওয়াশিংটনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।

অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে আরো জটিল করে তুলেছে । আমেরিকা ও ইসরাইলের ইরান হামলার দুদিন আগেই তেল আবিব মোদিকে স্বাগত জানিয়েছিল।

পাকিস্তানে ভারতের মিশন পরিচালনা করা ভারতের সাবেক কূটনীতিক টিসিএ রাঘবন বর্তমান বাস্তবতা স্বীকার করে বলেন, গত দেড় বছরে আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের সদৃশ দেখা গেছে। যদি পাকিস্তান ইরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে সফল হয়, তাহলে সে সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।

রাঘবন বলেন, পাকিস্তানের জন্য যা ভালো, তা ভারতের জন্যও ভালো হতে পারে। তিনি বলেন, এ সংঘাতের অবসান ঘটানো আমাদের এবং সবার জন্য অত্যন্ত লাভজনক।

ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা জয়রাম রমেশ বলেছেন, মোদি সরকার পাকিস্তানের উচ্চতর ‘কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিবৃতি পরিচালনার কৌশলের কাছে অচল হয়ে পড়েছে।

এ নেতা মোদির নীতি নিয়ে সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন, অপারেশন সিঁদুরে আমাদের সামরিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, এরপর পাকিস্তানের কূটনৈতিক যোগাযোগ ভারতের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক রাঘবন সতর্ক করে বলেন, ভারত দীর্ঘদিন থেকে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, পাকিস্তান বৈশ্বিক পর্যায়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ, এর পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং ভৌগোলিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। এরপরও পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে সফল হলে তা অনেকটা অবাক করার মতোই।

ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর অনেক বিশেষজ্ঞই ধারণা করেছিল আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো উচ্চপর্যায়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরপর ওভাল অফিসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ট্রাম্পের সঙ্গে দুদফায় সাক্ষাৎ করেছেন, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। ফলে নতুন করে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যদি পাকিস্তানের হাজির হওয়া, তাদের জন্য বড় কূটনৈতিক বিজয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...