জয়ন্তী রাজ্যের জয়ন্তীপুর

আসিফ আযহার

জয়ন্তী রাজ্যের জয়ন্তীপুর
চিত্র জয়ন্তীপুর নগরীর প্রাচীন নিদর্শন (ডলমেন)

উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের সভ্যতার ইতিহাস খুবই প্রাচীন। পৌরাণিক যুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শাসকদের হাতে উত্তর-পূর্ব ভারত ও সিলেটের বিভিন্ন রাজ্য শাসিত হয়েছে। এসব রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা রাজ্য ছিল জৈন্তিয়া। আনুমানিকভাবে ৩১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কিছু আগে পূর্ব মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল ও উত্তর সিলেটের সমতল ভূমি নিয়ে রাজ্যটির উদ্ভব হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত এটি কামরূপ অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ‘নারী রাজ্য’ বা ‘জয়ন্তী রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারী সরদারদের হাতে শাসিত হয়েছে। ষষ্ঠ শতকের কোনো এক সময় রাজ্যটির সমতল অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কামরূপের এক নারী শাসকের হাতে। সপ্তম শতকে এই সমতল অংশ ভেঙে লাউড়, গৌড় ও জৈন্তিয়া নামে তিনটি পৃথক রাজ্য আত্মপ্রকাশ করে। আদি জৈন্তিয়া রাজ্য তখন মূলত চারটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

পূর্ব মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল ছিল মাতৃপ্রধান পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন। আর সমতলের লাউড়, গৌড় ও জৈন্তিয়া ছিল তিনটি নতুন রাজবংশের শাসনাধীন। সপ্তম শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত সমতলের জৈন্তিয়া রাজ্যটি দুটি আলাদা রাজবংশের হাতে শাসিত হয়েছিল। ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে এই রাজ্য আবারও পাহাড়ি মাতৃপ্রধান জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে আসে। তত দিনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন এসেছিল। তাদের সমাজে নারী সরদারের স্থলে পুরুষ সরদারের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সরদারের উপাধি ছিল ‘সিয়েম’। ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে জৈন্তিয়া সমতলে সিয়েমের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজ্যটি তখন নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ায়। পাহাড় ও সমতল আবারও পাহাড়ি শাসকের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়। পরবর্তী তিন শতক ধরে পাহাড় ও সমতলের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিই রাজ্যটিকে প্রতিবেশীদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। অবশেষে ১৮৩৫ সালে রাজ্যটি ব্রিটিশদের হস্তগত হয়।

বিজ্ঞাপন

কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি জৈন্তিয়া রাজ্যের পাহাড় ও সমতল অঞ্চল বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছে। বাংলাদেশের সিলেট জেলার উত্তরাঞ্চল ছিল পাহাড়ি রাজাদের সময়কার জৈন্তিয়া রাজ্যের সমভূমি। আর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব জৈন্তিয়া পাহাড় ও পশ্চিম জৈন্তিয়া পাহাড়—এ জেলা দুটি ছিল তাদের রাজ্যের পার্বত্যাঞ্চল। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলাজুড়ে জৈন্তিয়া সমভূমি বিস্তৃত ছিল। কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশও জৈন্তিয়া সমভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিল। চার উপজেলার এই সমভূমি অঞ্চলে জৈন্তিয়ার ১৮টি রাজ বা পরগনার অস্তিত্ব ছিল। এই ১৮টি রাজ বা পরগনার নাম হচ্ছে—জয়ন্তাপুরী রাজ, জাফলং, চারিকাটা, ফালজুর, ধরগাম, চতুল, খরিল, পাঁচভাগ, আড়াইখা, চাউরা, মুলাগুল, সাতবাক, বাজেরাজ, পশ্চিমভাগ, বড়দেশ, বাউরভাগ, বর্ণফৌদ ও পিয়াইনগুল। অন্যদিকে মেঘালয়ের জৈন্তিয়া পাহাড়ে ছিল জৈন্তিয়ার রাজ্যের ১২টি পার্বত্য রাজ বা এলাকা (প্নার শব্দ এলাকা অর্থ হল পার্বত্য পুঞ্জি)। এগুলোর নাম হচ্ছে—Sutnga, Nartiang, Nongtalang or Natelang, Nangphyllut or Norpuh, Nongjngi, Nangbah, Lakadong, Shangpung, Mynso, Jowai, Raliang, Amwi or Rambhai ।

জৈন্তিয়া রাজ্যের আদি নাম ছিল ‘জয়ন্তী’। পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ জৈমিনি মহাভারতে রাজ্যটিকে এই নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। তান্ত্রিক সাহিত্যেও রাজ্যটিকে ‘জয়ন্তী’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কামাখ্যাতন্ত্র, তন্ত্রচূড়ামণি, কালিকাপুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণে ‘জয়ন্তী’ বা ‘জয়ন্ত্যাং’ শব্দের বারবার উল্লেখ দেখা যায়। জৈন্তিয়া রাজ্য সম্পর্কে এর প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর ইতিহাস থেকে অনেক কিছু জানা যায়। সেসব দলিলে জৈন্তিয়া রাজ্যকে ‘জয়ন্তীয়া’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কোচবিহারের ইতিহাস বংশাবলি, শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহ প্রণীত ত্রিপুরার ইতিহাস (রাজমালা), শ্রী পদ্মনাথ বরুয়া সম্পাদিত অসমৰ বুৰঞ্জী, রায় বাহাদুর সূর্য্য কুমার ভূঁইয়া রচিত জয়ন্তীয়া বুৰঞ্জী প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থে জৈন্তিয়া রাজ্যকে ‘জয়ন্তীয়া’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। মোগলানের (সিলেটের যেসব অংশ মোগলদের অধীনস্থ ছিল) ইতিহাসেও ‘জয়ন্তিয়া’ বা ‘জয়ন্তীয়া’ শব্দটির উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে ‘জয়ন্তীয়া’ শব্দটির স্থলে ‘জৈন্তিয়া’ শব্দটির প্রচলন হয়। এর কারণ ব্রিটিশরা বিভিন্ন ইংরেজি দলিলপত্রে এই অঞ্চলের জন্য ‘Jaintia’ শব্দটি ব্যবহার করত। স্যার এডওয়ার্ড গেইট তার হিস্টরি অভ আসাম গ্রন্থে এই শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে এই শব্দটি আরো সংক্ষেপিত হয়ে ‘জৈন্তা’ শব্দেও উচ্চারিত হয়।

জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল জয়ন্তীপুর। বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা সদরস্থ নিজপাট মৌজাটিই ছিল তখনকার যুগের রাজধানী শহর জয়ন্তীপুর। এই শহরটির গোড়াপত্তন কবে হয়েছিল, তা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। যেসব প্রাচীন দলিলে এই শহরটির কথা পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো হলো রাঘবপাণ্ডবীয় কাব্যগ্রন্থ। দ্বাদশ শতকে (১১০১-১২০০ সাল) রচিত এই কাব্যগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তৎকালীন জৈন্তিয়ার রাজা কামদেবের রাজধানী ছিল জয়ন্তীপুর। সিন্টেং জনগোষ্ঠীর রাজাদের আমলের যেসব তাম্রফলক উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোয় ‘জয়ন্তীপুর পুরন্দর’ কথাটির উল্লেখ রয়েছে। ‘জয়ন্তীপুর পুরন্দর’ কথাটির মানে হলো ‘জয়ন্তীপুরের শাসক বা রাজা’। সিন্টেং জনগোষ্ঠীর রাজাদের চালু করা মুদ্রাগুলোয়ও কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত বানানে এই কথাটির উল্লেখ রয়েছে। সিন্টেং রাজাদের আমলের দুই ধরনের মুদ্রা পাওয়া যায়—পূর্ণমুদ্রা ও সিকিমুদ্রা। সিকিমুদ্রাগুলোয় রাজার (যিনি মুদ্রা চালু করেছেন) নাম উল্লিখিত থাকলেও পূর্ণমুদ্রাগুলোয় রাজার নামের বদলে ‘জয়ন্তাপুর পুরন্দরস্য’ কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। ‘জয়ন্তাপুর পুরন্দরস্য’ কথাটির মানে হলো ‘জয়ন্তাপুরের শাসক বা রাজা’। জৈন্তিয়ার মুদ্রা ও তাম্রফলকে ‘জয়ন্তীপুর’ বা ‘জয়ন্তাপুর’ শব্দটিকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে মনে হয়, এই শব্দটি দ্বারা রাজ্য ও রাজধানী উভয়কেই বোঝানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন