‘আমি বড় হয়ে বিজ্ঞানী হব। অনেক নাম করব। তখন মানুষ তোমাদের নূরের বাবা-মা, নূরের বোন বলে চিনবে’—১৩ বছর বয়সি সামিউ আমান নূরের স্বপ্ন ছিল এটাই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তার সেই কথা সত্য হয়েছে; তবে বিজ্ঞানী হিসেবে নয়। স্বৈরাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার চালানো সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারানো নূর আজ মানুষের কাছে পরিচিত শহীদ নূর হিসেবে। আজ মানুষ তাকে মনে রাখছে শহীদ নূর হিসেবে–এক সাহসী কিশোর, যে বিজয়ের মুহূর্তে জীবন দিয়ে গেছে ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।
টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুর গাজীবাড়ি এলাকার একটি ছোট্ট পরিবারে জন্ম নেওয়া নূর ছিল মা-বাবার বহু প্রার্থনার ফল। সে পড়ত সিরাজউদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতনের সপ্তম শ্রেণিতে। শিক্ষকদের প্রিয়, বন্ধুদের কাছে নির্ভরতার নাম, আর পরিবারের কাছে ছিল পরম আরাধ্য ধন ‘নূর’।
তার মা শাহানুর আমান আমার দেশকে জানান, নূর নামটা ওর জন্য একদম ঠিক ছিল। যেমন নাম, তেমন মন। নামাজ পড়ত, রোজা রাখত, কোরআন পড়ত। কারো সঙ্গে ঝগড়া করত না। এককথায় বললে, শুধু আলো ছড়াত।
তবে সেই আলোর পথচলা থেমে যায় ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাইয়ের (৫ আগস্ট ২০২৪) রক্তাক্ত বিকালে। এর আগে ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সফল করতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয় নূর। সেদিন একবার পায়ে লেগেছিল রাবার বুলেট। কিন্তু বাসায় কাউকে কিছু বলেনি সে। কিছুটা খুঁড়িয়ে হাঁটলেও সে হাসিমুখে চলাফেরা করত, যেন কিছুই হয়নি। শাহানুর আমান বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট সকালে নূর ছিল বাসায়। দুপুরে খবর আসে স্বৈরাচার হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এই খবরে নূর আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। খুশিতে চিৎকার করে ওঠে ফোন করে বাবাকে জানায়, ‘শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো’। এরপর আর দেরি করেনি। বিজয়ের খবরে উত্তাল সড়কে বন্ধুদের সঙ্গে নেমে পড়ে বিজয় মিছিলে।
বিকাল ৩টার দিকে উত্তরা হয়ে বিজয় মিছিলের সঙ্গে ঢাকা অভিমুখে রওনা দেয় নূর। ফ্লাইওভারের ওপরে তখন আকাশ-বাতাস মুখর লাখো মানুষের স্লোগানে। সে সময় উত্তরা পশ্চিম থানা ও আশপাশের কয়েকটি ভবনের ছাদ থেকে গুলি ছুড়ছিল পুলিশ-ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। ফ্লাইওভার হয়ে উত্তরা বিএনএস সেন্টারের কাছাকাছি আসতেই একটি গুলি এসে লাগে নূরের মাথায়। গুলিটি তার কপালে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই লুটিয়ে পড়ে নূর। সহযোদ্ধারা নূরকে নিয়ে যায় টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও ততক্ষণে উত্তরা জসিম উদ্দিন এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। ফলে অ্যাম্বুলেন্স আর এগোতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত নূরকে নেওয়া হয় উত্তরা আধুনিক মেডিকেলে। কিছু সময় বেঁচে থাকলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। নূরের শিক্ষক শাহাদাত হোসেন বলেন, ও আমাকে দেখে কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু পারল না। আমি জানি, সে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। ওর চোখ বলছিল সবকিছু।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

