কানাডার শিখ অধিকারকর্মী মনিন্দর সিং ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের পাঁচ বিশেষজ্ঞ।
কানাডার কর্তৃপক্ষ ২০২২ সাল থেকে সিংকে তার জীবনের ওপর বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন হুমকির বিষয়ে চারবার সতর্ক করেছে।
কানাডা সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সিংকে ঘিরে ‘বিদেশি ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতিশোধমূলক তৎপরতার উদ্বেগজনক অভিযোগ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সিং কানাডার নাগরিক। গত ৩ জুন চিঠিটি লেখা হয়। প্রায় দুই মাস পর এটি প্রকাশ্যে আসে।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২২ সাল থেকে কানাডার কর্তৃপক্ষ সিংকে চারবার ‘ডিউটি টু ওয়ার্ন’ নোটিশ দিয়েছে। এসব নোটিশে তার জীবনের ওপর বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন হুমকির কথা জানানো হয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা কানাডাকে সিং ও তার পরিবারের সুরক্ষায় সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা কানাডার মাটিতে অবস্থানরত অন্য ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যথাযথ প্রতিকার দেওয়া এবং এ ধরনের ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
চিঠিটি লিখেছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার সুরক্ষা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারকর্মীদের সুরক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টার ও বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের এসব বিশেষ র্যাপোর্টার ও বিশেষজ্ঞ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার পরিষদ তাদের বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরির জন্য নিয়োগ দেয়। তারা জাতিসংঘের হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেন না। চিঠিটির একটি অনুলিপি ভারত সরকারকেও পাঠানো হয়েছে।
ভারতকে ঘিরে অভিযোগ
চলতি বছরের শুরুতে জেনেভায় জাতিসংঘের কাছে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন মনিন্দর সিং। বিদেশে শিখ অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ভারতের কথিত তৎপরতা এবং বৃহত্তর পরিসরে আন্তঃদেশীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে তিনি এ আহ্বান জানান।
শিখ অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করছে ভারত। সংগঠিত অপরাধী চক্র ব্যবহার করে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে ভারত।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড। ২০২৩ সালে কানাডার ভ্যানকুভারের একটি শহরতলিতে নিজ্জরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি যে শিখ মন্দিরের নেতৃত্ব দিতেন, তার কাছেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
মনিন্দর সিং ছিলেন নিজ্জরের বন্ধু। তৎকালীন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্রকাশ্যে ওই হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে কানাডার গোয়েন্দা সংস্থাও একই অভিযোগ করে। ভারত তা অস্বীকার করেছে।
হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারত ও কানাডার সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। ২০২৪ সালে দুই দেশই বেশ কয়েকজন কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।
তবে গত বছর মার্ক কার্নি কানাডার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত মার্চে কার্নি ভারত সফর করেন। দুই দেশ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি সই করে। একই সময়ে কানাডার কর্তৃপক্ষ আগের নিরাপত্তাঝুঁকির মূল্যায়নও কিছুটা গুরুত্বহীন করে দেখাতে শুরু করে।
খালিস্তানের পক্ষে সিং
৪৪ বছর বয়সী মনিন্দর সিং হরদীপ সিং নিজ্জরের মতোই শিখদের একটি প্রান্তিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। এই গোষ্ঠী স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার দাবি করে।
খালিস্তান আন্দোলনের শিকড় ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের এক প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ঘটনা এবং একটি যাত্রীবাহী বিমান বোমা হামলার ঘটনাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
বড় শিখ জনগোষ্ঠী রয়েছে—এমন কয়েকটি পশ্চিমা দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খালিস্তান ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা তাদের চিঠিতে বলেছেন, মনিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধে হুমকিগুলো কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে শিখ অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ‘আন্তঃদেশীয় দমন-পীড়নের বৃহত্তর ধারার’ অংশ কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
‘ভয় দেখিয়ে নীরব করা যাবে না’
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের চিঠিকে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের একটি স্মারক হিসেবে দেখছেন মনিন্দর সিং।
তিনি বলেন, ‘শিখদের আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলার কারণে তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে ভারতীয় রাষ্ট্র কত দূর যেতে প্রস্তুত, এই চিঠি তার একটি স্পষ্ট স্মারক।’
সিং আরো বলেন, ‘কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যখন ভিন্নমত দমাতে কানাডার মাটিতে সহিংসতা চালানোর সুযোগ পায়, তখন তা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় গভীর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।’
তিনি বলেন, ‘আমি ভয় দেখিয়ে নীরব করে দেওয়ার সুযোগ দেব না। খালিস্তানের পক্ষে আমার নেতৃত্ব ও প্রচারণার ভিত্তি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকারের নীতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আমার সম্প্রদায়ের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা।’
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

