বিহারের ভোটে ককরোচ আন্দোলনের ছাপ, বড় ধাক্কা খেল বিজেপি

বিহারের ভোটে ককরোচ আন্দোলনের ছাপ, বড় ধাক্কা খেল বিজেপি
বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী নীরজ কুমারকে ১৯ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেন প্রশান্ত কিশোর।

ভারতের বিহারের রাজনীতিতে চমক দেখিয়েছেন সাবেক ‘ভোটকুশলী’ প্রশান্ত কিশোর (পিকে)। ককরোচ জনতা পার্টির প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর প্রথম ভোটের মুখোমুখি হয়েছিল বিজেপি। কিন্তু এখানেও সেই ককরোচ আন্দোলনের স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। নিজেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বাঁকিপুর আসনে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি।

বিজ্ঞাপন

গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী নীরজ কুমারকে ১৯ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেন পিকে। তিনি পেয়েছেন ৬৩ হাজারের বেশি ভোট। বিজেপির নীরজ কুমার পেয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার ভোট। অন্যদিকে আরেক প্রার্থী আরজেডির রেখা কুমারী পেয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার ভোট।

বাঁকিপুর আসনটি এতদিন বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। আসনটি ছিল বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দখলে। তিনি রাজ্যসভায় যাওয়ার পর আসনটি শূন্য হলে সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রথমবার পটনা সাহিব লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বাঁকিপুরে বিজেপি পরাজয়ের মুখ দেখল।

১৯৯৫ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পর পর চার বার এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন নিতিনের পিতা নবীন কিশোর প্রসাদ সিন্‌হা। ২০০৮ সালের আসন পুনর্বিন্যাসের পরে ২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত টানা চার বার জয়ী হন নিতিন। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে রাজ্যসভায় নিতিনকে জিতিয়ে এনেছিল দল। তিনি বিধায়কপদে ইস্তফা দেওয়ায় বাঁকিপুরে উপনির্বাচন হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের পর বিজেপির জন্য এটিই ছিল প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা। দিল্লির যন্তর মন্তরের পর বিহারেই ওই আন্দোলন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক প্রশ্নফাঁস-দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রভাব উপনির্বাচনের ফলে পড়েছে।

দীর্ঘদিন নির্বাচনী কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত থাকা পিকে সরাসরি রাজনীতিতে নেমে গড়া জনসুরাজ পার্টি নিয়ে প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় ধাক্কা খেলেও মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির নির্বাচনী কৌশল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রশান্ত কিশোর। এরপর তিনি তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেন। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পেছনে তার প্রতিষ্ঠান আইপ্যাকের ভূমিকার কথাও আলোচিত হয়।

যে পিকে ভোটকুশলী হিসাবে একসময় নগদের রাজনীতিতে, জাতপাত, ধর্ম-বর্ণের অঙ্ক কষে রণকৌশল সাজাতেন। পরবর্তীতে, তিনি নেতা হয়ে হেঁটেছেন ভিন্নপথে। গান্ধীর দর্শনে গোটা বিহার জুড়ে যাত্রা করে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতার মাধ্যমে প্রচারের ধাঁচে নিজেকে ভিন্ন গোত্রের রাজনীতিক হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

তার প্রচারে বেশি বেশি করে উঠে আসছিল বিহারের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ। কেন তারা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে অন্য রাজ্যে থাকেন? কেন রাজ্যে কাজ নেই? কেন জাত-ধর্মের বৈষম্য? তুলে ধরেছিলেন বিহার এবং বিহারীর মর্যাদার প্রশ্নও।

বাঁকিপুরের জয়কে প্রশান্ত কিশোর বিহারের মানুষের জয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, এই ফল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি একটি বার্তা যে বিহারের মানুষ যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব চায়।

এদিকে শুধু বিহার নয়, ভারতের আরও দুটি বিধানসভা উপনির্বাচনেও বিজেপির ভোট কমেছে। মধ্যপ্রদেশের দতিয়া আসনে কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং বিজেপিকে হারিয়েছেন। অন্যদিকে গুজরাটের মঞ্জলপুর আসন ধরে রাখলেও সেখানে বিজেপির ভোট কমেছে।

দতিয়ায় ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিজেপি প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, যা এবার কমে ৩৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মঞ্জলপুরে বিজেপির ভোট ৭৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে কংগ্রেসের ভোট ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনীতিতে এই উপনির্বাচনের ফল বিজেপির জন্য সতর্কবার্তা এবং প্রশান্ত কিশোরের জন্য রাজনীতির মাঠে নতুন করে আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন