বর্ষার মুষলধারে বৃষ্টিতে প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পেলেও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া আমাদের পায়ের জন্য নিয়ে আসে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। রাস্তায় জমে থাকা নোংরা পানি, কাদা ও বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এ সময় দাদ, অ্যাথলিটস ফুট কিংবা নখের ছত্রাকজনিত সংক্রমণের মতো চর্মরোগের প্রকোপ বহুগুণ বেড়ে যায়। শরীরকে সচল রাখা ও সার্বিক সুস্থতার অন্যতম চাবিকাঠি হলো পা। তাই বর্ষায় পা জীবাণুমুক্ত, সতেজ ও সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় কিছু পরামর্শ দিয়েছেন আমানুর রহমান
ছত্রাক থেকে মুক্তির উপায়
বৃষ্টিতে পা ভিজলে কিংবা রাস্তায় জমে থাকা নোংরা পানির সংস্পর্শে এলে ঘরে ফিরেই পা ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে ফেলা উচিত। পায়ের আঙুলের ফাঁকে জমে থাকা অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা ছত্রাকের বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বৃষ্টির পানি ত্বকে টানা আধঘণ্টার বেশি লেগে থাকলে চামড়ার রন্ধ্র নরম হয়ে যায়; এতে ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তাই বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে পা ধুয়ে নরম তোয়ালে দিয়ে আঙুলের ফাঁকের পানি খুব ভালোভাবে মুছে ফেলতে হবে। এরপর খোলা বাতাসে কিছুক্ষণ পা শুকিয়ে নেওয়া ত্বককে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে প্রাথমিক অথচ শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা। পরিচ্ছন্ন ও শুকনো পা যেকোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
পায়ের যত্নে সঠিক জুতা নির্বাচন
বর্ষার দিনে ফ্যাশনের চেয়ে জুতার গুণগত মান ও উপযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। চামড়া বা ক্যানভাসের তৈরি ভারী জুতা বৃষ্টির পানিতে ভিজলে সহজে শুকাতে চায় না। ভেজা চামড়ার জুতা সম্পূর্ণ শুকাতে প্রায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে। দীর্ঘ সময় ভেজা জুতা পরে থাকার অর্থ হলো পায়ে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আস্তানা গড়ে তোলার সুযোগ করে দেওয়া। এর পরিবর্তে বর্ষাকালে রাবার, পিভিসি বা বিশেষ পানিনিরোধক (ওয়াটারপ্রুফ) উপাদান দিয়ে তৈরি খোলা ও বাতাস চলাচলের উপযোগী স্যান্ডেল পরা উচিত। যেসব জুতায় পানি আটকে থাকে না এবং যা দ্রুত শুকিয়ে যায়, তা পায়ের ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণ অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। সঠিক পাদুকা নির্বাচন শুধু পথচলাকেই স্বস্তিদায়ক করে না, বরং বর্ষাকালীন চর্মরোগের বড় ঝুঁকি থেকেও পা সুরক্ষিত রাখে।
সহজ ঘরোয়া যত্ন
সারা দিনের ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি পায়ের গভীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে ঘরে তৈরি ‘ফুট বাথ’ বা ঈষদুষ্ণ পানির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। একটি পাত্রে সহনীয় গরম পানিতে (প্রায় ৩৭ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) কিছুটা সামুদ্রিক লবণ এবং কয়েক ফোঁটা অ্যান্টিসেপটিক তরল বা নিমের নির্যাস মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখলে দারুণ উপকার মেলে। স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, হালকা গরম পানি ও লবণের মিশ্রণ ত্বকের উপরিভাগে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের কোষপ্রাচীর ভেঙে ফেলে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনে। এই প্রক্রিয়া শুধু পায়ের ত্বকে জমে থাকা ক্ষতিকর জীবাণুই ধ্বংস করে না, বরং রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে পেশির ক্লান্তিও দূর করে। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে দিনগুলোয় সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এই ঘরোয়া যত্ন নিলে পা থাকবে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত।
ফাটা গোড়ালির যত্ন
বর্ষাকালে বারবার পানি লাগার ফলে পায়ের ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে গোড়ালি ফাটার সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। ফাটা গোড়ালি শুধু সৌন্দর্যেরই হানি ঘটায় না, বরং এর গভীর ক্ষত দিয়ে ত্বকের ডার্মিস স্তরে জীবাণু প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে রাতে ঘুমানোর আগে পায়ে ভালো মানের পেট্রোলিয়াম জেলি বা ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, দিনের বেলায় পায়ের আঙুলের ফাঁকে ঘাম ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা রোধে অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার ব্যবহার করা উচিত। নিয়মিত অ্যান্টিফাঙ্গাল ডাস্টিং পাউডার ব্যবহারে আঙুলের ফাঁকে চর্মরোগের প্রকোপ কমে যায়। মূলত সঠিক সময়ে সঠিক উপাদানের এই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারই বর্ষায় পা সুস্থ, কোমল ও সংক্রমণমুক্ত রাখে।
নখের বিশেষ যত্ন
বর্ষাকালে পায়ের সুরক্ষায় নখের যত্নের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হলেও চর্মরোগের বড় একটি উৎস লুকিয়ে থাকে এই নখেই। বড় নখের কোণে জমে থাকা নোংরা কাদাপানি ও জীবাণু থেকে ‘অনিকোমাইকোসিস’-এর মতো মারাত্মক ছত্রাকজনিত সংক্রমণ হতে পারে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষায় নখের যত্নে অবহেলার কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ নখকুনি বা নখ পচে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভোগেন। তাই বর্ষার শুরুতেই পায়ের নখ সোজা ও ছোট করে কেটে রাখা উচিত, যাতে ভেতরে ময়লা জমার সুযোগ না থাকে। নখ কাটার পর এর কোণগুলো মসৃণ করে চারপাশে সামান্য নারকেল তেল বা টি-ট্রি অয়েল লাগানো যেতে পারে, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি নখ শুধু সুন্দর পায়ের পরিচয়ই নয়, এটি ছত্রাকের আক্রমণের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ঢাল।
মোজা ব্যবহারে সতর্কতা
যারা পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিদিন আবদ্ধ জুতা ও মোজা পরতে বাধ্য হন, বর্ষাকালে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটাই বেশি। সিনথেটিক বা নাইলনের মোজা পায়ের ঘাম শুষে নিতে পারে না, বরং আর্দ্রতা আটকে রেখে দুর্গন্ধ ও নানা ধরনের সংক্রমণ তৈরি করে। এর বিপরীতে শতভাগ সুতির মোজা ব্যবহার করা শ্রেয়। সুতির তন্তু নিজের ওজনের চেয়ে প্রায় ২৭ গুণ বেশি আর্দ্রতা শোষণ করতে সক্ষম। প্রতিদিন ধোয়া, পরিষ্কার ও শুকনো মোজা পরা এবং প্রয়োজনে দিনে দুবার মোজা পরিবর্তন করা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। স্যাঁতসেঁতে মোজা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে থাকার অর্থ হলো জীবাণুকে স্বেচ্ছায় আমন্ত্রণ জানানো, যা থেকে রেহাই পাওয়ার মূল উপায় সুতির মোজার পরিচ্ছন্ন ব্যবহার। এই সামান্য সচেতনতাই আবদ্ধ জুতার ভেতরের পরিবেশকে সারা দিন জীবাণুমুক্ত ও সতেজ রাখতে পারে।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


