মারগেট বিচে গিয়েছিলাম। সেই গল্প লেখাও হয়েছে। এরই মধ্যে এক বছর কেটে গেল! আবার শীতের দেশে ক্ষণিকের প্রশান্তি নিয়ে হাজির ‘গ্রীষ্মকাল’। আর এমন দিনে সমুদ্র থেকে ঘুরে না এলে হয়? এবারের গন্তব্য দিগন্তবিস্তৃত সোনালি বালুচর ও বালিয়াড়ির জন্য বিখ্যাত ‘ক্যাম্বার স্যান্ডস সি বিচ’।
প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকে। আয়োজনে ইসলামিক সোসাইটি অব কানাইঘাট ইউকে। দিন-তারিখ ঠিক হলো। নির্ধারিত বিভাগের জন্য দায়িত্বরতদের কাজ তদারকি করছিলেন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। মিডিয়া আর টি-শার্টের দায়িত্ব আমার ওপর। সাহস করে বাংলাদেশ থেকে টি-শার্ট অর্ডার দিলাম। ‘টেনরাস’ (TenRus) নামক প্ল্যাটফর্ম থেকে নেওয়ায় ডিজাইন ও কাপড়ের মান নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। বাকি কাজও নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হলো।
রোদ-ঝলমলে সকালে ঐতিহাসিক আলতাব আলী পার্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। উপস্থিত ছিলেন—ইস্ট লন্ডন মসজিদের ইমাম ও খতিব শায়খ আবুল হোসাইন খান। নাশতা আর গ্রুপ ছবি তুলে বাসের উদ্দেশে রওনা হলাম। একটি বড় বাস এবং আরেকটি ছোট। সব মিলিয়ে ৬৬ জনের বিশাল বহর। বাসের জানালা দিয়ে দেখতে লাগলাম বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, রকমারি চাষাবাদ। এর মধ্যে ছোট ছোট ঘর বিশেষ নজর কাড়ে। পুরো যাত্রাপথে সবার অংশগ্রহণে উজ্জীবিত ছিল সাংস্কৃতিক এবং প্রীতি আড্ডার আয়োজন। তেলাওয়াত, নাশীদ কিংবা গানের সুর যেমন ছিল, তেমনি অভিনয় ও আবৃত্তির সঙ্গে কৌতুক। ফলে হাসির উপাদানের কমতি ছিল না। ইব্রাহীম আলী ভাই, হাফিজ সোহেল ভাই, রেজওয়ান ভাই, আবিদ ভাই, শাখাওয়াত ভাইদের সঙ্গে নাজিফ, ইলিয়াস ও কাওসারের মনমাতানো উপস্থাপনা যুক্ত করে বাড়তি আমেজ।
দুপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি গ্রাম, খাঁজকাটা চাষের ক্ষেত; তারপর আবার উঁচু জমি, ঘন বন; কোথাও আবার ভেড়ার পাল। সেইসঙ্গে সমন্বিত সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করতেই করতেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। দুঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেছে—টেরই পেলাম না!
একদম সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি নামলাম। রোদেলা দিন আর বাতাস যেন মন ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বিশাল ফুটবল মাঠে আমাদের পূর্বনির্ধারিত আয়োজনগুলো শুরু হলো; বিশেষ করে হাঁড়িভাঙা, বেলুন ফুটানো, মোরগ লড়াই ও ফুটবল ম্যাচ। সবার অংশগ্রহণে উজ্জীবিত ছিল পুরোটা সময়। পর্যটকদের অনেকেই দাঁড়িয়ে গেলেন; দেখতে লাগলেন—কী হচ্ছে এত উচ্ছ্বাস নিয়ে।
খাবার আর নামাজ শেষ করে এবার সমুদ্রে নামার পালা। যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ সৈকতই পাথুরে হলেও ক্যাম্বার স্যান্ডস ব্যতিক্রম। বাতাসের তীব্র গতির সঙ্গে বালুর মিশ্রণে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। একপাশে খোলা সমুদ্র; আর অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ির বিশাল টিলা। টিলাজুড়ে সবুজাভ ‘মারাম গ্রাস’ (Marram Grass)। পরম আবেশে বাতাস মারাম গ্রাসকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। বাতাসের ছোঁয়ায় দুলছে ঘাসগুলো। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর বালিয়াড়ির মাঝখানে শূন্য বালুরাশির দৃষ্টিনন্দন এক সৈকত! ভাটার সময় বলে এর বিশালতা পেয়েছে আরো বেশি। সমুদ্রের মৃদু ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত, গাঙচিলদের ওড়াউড়ি আর মারাম গ্রাসের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্য যেন প্রকৃতিপ্রেমের অনন্য উদাহরণ।
সমুদ্রসৈকত বলতে আমরা যেমনটা অনুভব করি
এখানেও তেমন। পা ডুবিয়ে হেঁটে বেড়ানো, পানির কাছাকাছি বসে থাকা। আবার বালুতে উদোম হয়ে শুয়ে থাকাটা বেশি চোখে পড়ল, ছোট-বড় কেউ বাদ নেই। তবে এখানে ‘কাইটসার্ফিং’ করতে দেখা গেল অনেক। এককথায় আট কিলোমিটারের বালুকাময় সৈকতে উল্লাস-উদ্যাপনের কমতি ছিল না।
ফেরার আগে আবারও সেই ফুটবল মাঠে। খেলাধুলায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ। এ সময় নিজ দেশ ছেড়ে প্রবাসে আমাদের পথচলা, সংঘবদ্ধ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বললেন সংগঠনের সভাপতি সাইয়িদ জামাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ ইয়াহিয়া এবং ট্রেজারার সালাহ উদ্দিন। সবাই এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা এবং আগামী দিনে বড় পরিসরে করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেন।
সময় পেরোয়। ফিরতে হবে আমাদের। সমুদ্রের মুক্ত বাতাস। চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক শোভা। গাঙচিলদের ওড়াউড়ি। এসব রেখে চলে আসাটা ‘ভালো লাগা’র ছিল না। বাস চলছে গন্তব্যের দিকে। চলছে গান-গল্পও। কিন্তু মাথায় গেঁথে রইল সেই ‘ক্যাম্বার স্যান্ডসের’ মায়াবী দৃশ্য। রোদ-ঝকমকে দিনে পাথর-সাগর আর নীলের কথা মনে হতেই ‘খারাপ’ লাগার ভিড়। গোধূলি সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার জন্য হলেও এমন জায়গায় অনায়াসে যাওয়া যায়। ধূসর-মেঘগ্রস্ত দিনে আরেকবার ফেরত গেলে মন্দ হয় না, একটু বেশি সময় নিয়ে...
যেখানে ক্যাম্বার স্যান্ডস সি বিচ
ক্যাম্বার স্যান্ডস সমুদ্রসৈকত ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব কাউন্টি পূর্ব সাসেক্সের ক্যাম্বার (Camber) গ্রামে অবস্থিত, যা আট কিলোমিটার লম্বা বালুকাময় সৈকত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

