১৯ বছর পর কলকাতায় তসলিমা বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ

১৯ বছর পর কলকাতায় তসলিমা বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ
ছবি: সংগৃহীত।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় এসেছেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এতে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট নাগাদ তিনি কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ সময় শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হয়। কেউ কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছাতেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। দ্রুত বিজেপি সরকারের গাড়িতে উঠে এলাকা ছাড়েন তিনি।

জানা গেছে, আজ শনিবার রবীন্দ্র সদনে সেক্যুলার মিশন ও এইচআরবিএফএফের একটি অনুষ্ঠানে তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত থাকতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, তসলিমার আগমনে বিজেপি ভক্তরা আনন্দে লাফাতে শুরু করেন এবং কেউ কেউ তাকে ‘মোদিভক্তদের নতুন মা’ আখ্যা দেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ নেটিজেনদের মধ্যে চরম বিরক্তি দেখা গেছে এবং সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

নেটিজেনরা রীতিমতো ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তুলছেন, উনি কলকাতায় ফেরায় আখেরে লাভটা কী? কটাক্ষ করে অনেকেই বলছেন, একসময়ের পুরোনো লেখকরা তো মরে গেছেন আর অনেকেই বিয়ে করে বাচ্চার বাবা হয়ে গেছেন। ফলে তসলিমার সঙ্গে আর তাদের শোয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তীব্র শ্লেষাত্মক এসব মন্তব্যই প্রমাণ করে, তসলিমার সাহিত্যকর্মের চেয়ে তার বিতর্কিত ব্যক্তিগত জীবন এবং সস্তা প্রচার পাওয়ার নেশা নিয়েই মানুষের ক্ষোভ বেশি।

তসলিমার এই ‘উগ্র নারীবাদের’ আসল রূপ নিয়ে কলকাতার তালিম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বিশিষ্ট গবেষক আবু রিদার ‘তসলিমা নাসরিন : জীবনবোধ ও যৌনচেতনা’ বইটিতে চমৎকারভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। তসলিমার প্রথম স্বামী বা প্রেমিক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঈশাক খান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি তার লেখায় জানিয়েছেন, তসলিমা যদি দাবি করেন, বাংলাদেশে নারী স্বাধীনতা নেই, তবে রুদ্রের পর তিনি পরপর কীভাবে আরো তিনজনকে (নাঈমুল ইসলাম, মিনার মাহমুদ ও হাবিবুল্লাহ বিশ্বাস) বিয়ে করলেন? নিজের রচিত ‘ক’ গ্রন্থে তসলিমা নিজেই কতজনের সঙ্গে লিভ টুগেদার করেছেন তার পরিসংখ্যান দিয়েছেন।

কেউ কেউ তাকে ‘মোদিভক্তদের নতুন মা’ আখ্যা দেন

এমনকি কলকাতায়ও কার কার সঙ্গে তিনি লিভ টুগেদার করেছেন, তার বর্ণনাও দিয়েছেন। এ তালিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হাসমত জালাল থেকে শুরু করে অনেকের নাম রয়েছে। অনেকে তাই ব্যঙ্গ করে বলছেন, কলকাতায় ৩১ জুলাই ঢুকে পড়া তসলিমার এই ‘বহুগামী উগ্র নারীবাদ’ আরো বিকশিত হোক।

তসলিমা নাসরিন হয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ভুলে গেছেন, প্রকৃত নারী স্বাধীনতা আর বহুগামিতার আস্ফালন এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের নারীরা যে কতটা স্বাধীন ও স্বাবলম্বী, তা দেশের ইতিহাস ঘাঁটলেই স্পষ্ট হয়। অল্প বয়সে স্বামী মারা গেলে বা ডিভোর্স হলেও বাংলাদেশের নারীরা এখন নিজেরাই মিডিয়ায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় পুনরায় বিবাহের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। তসলিমা যে দেশে নারী স্বাধীনতার অভাব দেখেন, সে দেশেই তৈরি হয়েছেন ফজিলাতুন্নেছা, বেগম রোকেয়া, জাহানারা ইমাম, বেগম সুফিয়া কামাল, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেন কিংবা নাসরিন সুলতানার মতো মহীয়সীরা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এ দেশের মেয়েদের মিছিল থেকেই পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙা হয়েছিল এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধে লাখো নারী নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। দেশের সঙ্গীত, নাটক ও সিনেমায়ও নারীদের উজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

২০০৭ সালে ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের বিতর্কের জেরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে তাকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনামলেও তার ফেরার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অবশেষে শুভেন্দুর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে তার এ প্রত্যাবর্তনকে ‘লজ্জা-মুক্তি’ বা আলোকময় অধ্যায় বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন