কাজের সন্ধানে প্রায় দুই দশক আগে স্বামীর সঙ্গে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার সাহিদা ফকির। সেখানে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন তিনি। গত ১৯ জুলাই স্থানীয় বাজারে রুটি-তরকারি কিনতে গেলে তাকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে নাভি মুম্বাই পুলিশ আটক করে বলে অভিযোগ।
সাহিদার পরিবারের দাবি, কয়েকদিন একটি হোল্ডিং সেন্টারে রাখার পর কোনো তদন্ত বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তাকে আসাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশ আউট’ করা হয়। মায়ের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন তার বড় ছেলে সাহিন ফকির। সেই মামলায় বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।
তবে সাহিদাকে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। কেন্দ্রের বক্তব্য শোনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
গত ১৭ আগস্ট দায়ের করা রিট আবেদনে সাহিন তার মাকে দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সেখানে যেন তিনি কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। আবেদনকারীর পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর। মামলাটির নাম ‘সাহিন ফকির বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড আদার্স’।
আবেদনে সাহিন দাবি করেন, তার মা উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবিন্দপুরের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ভারতীয় নাগরিক। ১৯ জুলাই তাকে আটকের পর পাঁচ দিনের বেশি সময় হেফাজতে রাখা হলেও কোনো বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়নি। আটকের কারণ জানানো হয়নি এবং পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে সাহিদাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩১ জুলাই তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হলে তারা জানতে পারে যে সাহিদা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
সাহিনের দাবি, তার মায়ের ভারতীয় নাগরিকত্বের পক্ষে ভোটার কার্ড, জন্মনিবন্ধন সনদ, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড ও জমি-সংক্রান্ত নথিসহ একাধিক প্রমাণ রয়েছে। পরিবারের পুরোনো ভোটার তালিকাতেও তাদের নাম রয়েছে। সাহিদার দাদুর নাম ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকায় এবং তার বাবা-মায়ের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল বলে আবেদনে বলা হয়েছে।
তবে এসআইআর প্রক্রিয়ায় সাহিদার নিজের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এ বিষয়ে তিনি আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সাহিদাকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ২ মে জারি করা অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যর্পণসংক্রান্ত মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতি এবং ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫’-এর কয়েকটি বিধানের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
আবেদনকারীর বক্তব্য, কাউকে বিদেশি হিসেবে শনাক্ত করা থেকে শুরু করে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত যথাযথ যাচাই ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত না করা হলে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকও ভুল শনাক্তকরণের শিকার হতে পারেন। সাহিদার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদে দেওয়া অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য ২০২৫ সালের সংশ্লিষ্ট আদেশে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। কিন্তু সাহিদার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তার ছেলে।
এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিল, মানবিক কারণে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া কয়েকজন বাঙালি মুসলিমকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সাহিদা ফকিরকে বাংলাদেশে পাঠানোর আগে তার নাগরিকত্ব যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং পরিবারের অভিযোগের সত্যতা কতটা—এসব বিষয়ে বৃহস্পতিবার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি আদালত। কেন্দ্রের জবাব পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

