আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক

ভারত কি উপনিবেশবিরোধী অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে

আমার দেশ অনলাইন

ভারত কি উপনিবেশবিরোধী অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে

ভারত ও ইসরাইল প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে অভিন্ন স্বার্থের উপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। ১৯৯২ সালে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর এখন তাদের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইসরাইল ভারতের শীর্ষ প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে এবং একই সঙ্গে ভারত ইসরাইলি প্রযুক্তির একটি প্রধান বাজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে একটি বিশেষ ও উচ্চ-আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ইসরাইলের ফ্যাসিবাদী অবস্থানের সাথে এই সৌহার্দ্য ভারতকে এমন একটি দেশের সাথে সংযুক্ত করে যা ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী, বর্ণবাদী, ঔপনিবেশিক, সামরিকবাদী এবং বিশ্বের একমাত্র সরকারী বর্ণবাদী রাষ্ট্র।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী আগামী ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সফরের কথা রয়েছে, এটি তার তৃতীয় মেয়াদের সফর। সম্পর্ককে আরো গভীর করার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, উচ্চ পর্যায়ের সফর। ভারত ও ইসরাইলের অংশীদারিত্ব—যা গভীর প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতার মাধ্যমে চিহ্নিত—প্রায়ই সমালোচিত হয় এই অভিযোগে যে, এটি কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে ডানপন্থী ও সংখ্যালঘুবিরোধী নীতিকে উৎসাহিত করছে। এটি ভারতের ফিলিস্তিনের প্রতি ঐতিহাসিক সংহতির অবস্থান থেকে সরে এসে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এক কৌশলগত ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেওয়ার স্পষ্ট পরিবর্তন, যা ক্রমশ ইসরাইলের সঙ্গে একটি যৌথ ‘দখলদারিত্বের নীতিমালা’ ভিত্তিক ‘সহাবস্থানমূলক’ সম্পর্ক হিসেবে অভিযুক্ত হচ্ছে।

এই দ্রুত বিকশিত অংশীদারিত্বের সমালোচনার মূলে রয়েছে আদর্শগত এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার উদ্বেগ।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে উঠেছে তথাকথিত ‘দখলদারিত্বভিত্তিক’ প্রযুক্তির ওপর। ভারত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। মিডল ইস্ট আই-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাংবাদিক আজাদ এসা যুক্তি দিয়েছেন যে, বিশেষ করে নজরদারি ও ড্রোন প্রযুক্তি—উভয় দেশেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা করছে।

শুধু ইয়াসিন আরাফাত কিংবা ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক ঘনিষ্ঠতাকে মূল্য দেওয়া প্রবীণ প্রজন্মই নয়, আধুনিক প্রগতিশীলরাও এটিকে উপনিবেশবিরোধী নীতিমালা থেকে সরে আসা হিসেবে দেখেন। কৌশলগত, প্রকাশ্য ও উষ্ণ এই সম্পর্ককে ভারতের ঐতিহাসিক উপনিবেশবিরোধী অবস্থান এবং তার দৃঢ় ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এমন অভিযোগও রয়েছে যে, এই সম্পর্ক এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে ফিলিস্তিনি অধিকারের সমর্থনকে ভারতবিরোধী বা হামাসপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং তা নাকি ইসলামোফোবিয়ার উত্থানের সঙ্গেও কোনোভাবে যুক্ত।

এই সম্পর্কের মধ্যে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বও রয়েছে। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, ভারতকে আরব দেশসমূহ ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়—যা প্রায়শই ইসরাইলের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে জাতিসংঘে ভারতের ভোটদানে এক ধরনের দোলাচল দেখা যায়—কখনও ইসরাইলপন্থী, কখনও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান। পশ্চিম এশিয়া সম্পর্কে ভারতের নীতির কেন্দ্রবিন্দু কোথায়—তা নির্ধারণ করাই কখনও কখনও কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে সমালোচকেরা তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন এবং সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। ভারত ইসরাইল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও মানববিহীন আকাশযান (যেমন হেরন ও হার্মিস ৯০০) আমদানি করেছে। রাইফেল ও অন্যান্য অস্ত্র উৎপাদনের যৌথ উদ্যোগ (যেমন আদানি ডিফেন্সের সঙ্গে) একটি “অশুভ” গভীরতর জোটের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়া, ইসরাইলি নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতে ক্রমশ বাড়ছে, যা মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগ উত্থাপন করছে।

নরেন্দ্র মোদি তার ইসরাইল সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যায়িত করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে ‘ইসরাইল ও ভারতের মধ্যে বন্ধন একটি শক্তিশালী জোট’। নেতানিয়াহু ভারতের “অটল সমর্থন”-এর কথা উল্লেখ করেছেন, এবং মোদির আসন্ন সফরকে বিশ্বব্যাপী ইসরাইলকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে একটি “বড় কূটনৈতিক বিজয়” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারত ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামলার নিন্দা করেছিল, একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে ‘ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তি’র আহ্বান জানিয়েছিল এবং মানবিক সহায়তার পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল। সংঘাত শুরুর পর ভারত ইসরাইলকে সামরিক সহায়তাও প্রদান করেছে। ভারতের এই অবস্থান গ্রহণের ভেতরে এক ধরনের দ্বৈত বক্তব্য বা দ্বিমুখী অবস্থানের উপাদান লক্ষ্য করা যায়—যা কয়েক দশক ধরে সব স্তরে গভীর সংহতির ইতিহাসের পর এক ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

২০১৮ সাল থেকে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের সাথে তার সম্পর্ক স্বাধীনভাবে ("ডি-হাইফেনেশন") পরিচালনা করে আসছে। ভারত যুক্তি দেয় যে তারা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে সমর্থন করে চলেছে এবং ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তা প্রদান করে, একই সাথে ইসরাইলের সাথে তার কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরো গভীর করে তোলে।

প্রথমদিকে দৃঢ়ভাবে ইসরাইলপন্থী অবস্থান গ্রহণ করলেও, ২০২৫ সালের শেষভাগ ও ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এসে ভারত তার অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে বলে মনে হয়, যাতে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য পুনঃস্থাপন করা যায়। এর মধ্যে পশ্চিম তীরে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করাও অন্তর্ভুক্ত।

ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক জোট আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভারত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক, উন্নয়নমূলক ও মানবিক সম্পর্কও অব্যাহত রেখেছে।

সংক্ষেপে, ভারত-ইসরাইল অংশীদারিত্ব নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি দ্বারা চালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জোটে পরিণত হয়েছে, যা জাতীয় স্বার্থ এবং ভারতের দীর্ঘস্থায়ী পররাষ্ট্র নীতির নীতিগুলির মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ভারত মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তার আহ্বান জানালেও, তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির দাবিতে জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলিতে শুরুতে বিরত থেকে ছিল—যা ভারতের ভেতরে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের সমালোচনার কারণ হয়েছিল। মোদি সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে এই সম্পর্ক যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে, এবং হামাসের হামলার পর ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছে।

হামাসের হামলাকে একটি অব্যাহত ‘নাকবা’র প্রেক্ষাপটে চলমান প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে—এমন মতও রয়েছে। প্রতিরোধ একটি অধিকার; দখলদারিত্ব একটি অপরাধ। ভারতকে ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ়, নীতিনিষ্ঠ ও নৈতিক অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে—যা কেবল লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বা অভ্যন্তরীণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির পরিবর্তে সংবিধানের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়ের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর জন্য মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং অভ্যন্তরীণ বৈষম্য দূর করা জরুরি।

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়, যাতে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের সেবা করে। ‘গণতন্ত্রের জননী’ এবং গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে ভারতের উচিত আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং গাজার মতো পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, যাতে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে।

ভারতের পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে কেবল কৌশলগত বা অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত—এতে তার নৈতিক দিকনির্দেশনা পুনরুদ্ধার হবে। একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে ভারতের কর্মকাণ্ডকে তার মৌলিক নৈতিক ও সাংবিধানিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।


মিডল ইস্ট মনিটরের নিবন্ধ। ভাষান্তরে মো. মাহফুজুর রহমান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন