সিএনএনকে মোজতবা আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টার সাক্ষাৎকার

২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড় না দিলে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি নয়

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড় না দিলে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি নয়
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজাই। । ছবি: সংগৃহীত

জব্দ করা ইরানের ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে না দিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নয় বলে জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লড়াই পুনরারম্ভ হলে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অন্ধকার সুড়ঙ্গে’ প্রবেশ করবে।

শুক্রবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

তেহরানে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মহসেন রেজাই বলেন, ‘আলোচনা এখন অচলাবস্থায় রয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই অচলাবস্থা ভাঙতে হবে। বল এখন ট্রাম্পের কোর্টে।’

জানা গেছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই অবরুদ্ধ তহবিলের ১২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী ধাপে আরো ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের দাবি জানিয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন যে, এই পর্যায়ে তহবিল ছেড়ে দিলে তা ইরানের ওপর থাকা প্রধান একটি চাপ সরিয়ে দেবে।

তা ছাড়া ট্রাম্পের দাবি, যেকোনো চুক্তি যেন ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয় এবং সেখানে যেন এমন কিছু না থাকে, যা ‘নগদ টাকার প্যালেট’ হস্তান্তরের মতো মনে হয়। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার তেহরানকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করতে ট্রাম্প এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে থাকেন।

ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত মহসেন রেজায়ি সিএনএনের কাছে দেশটির যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনা, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং পুনরায় আক্রান্ত হলে ইরানের কৌশল কী হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরাইলি হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আর জনসমক্ষে আসেননি, রেজায়ি তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজায়ি প্রধান যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তা হলো-

অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা: এই দাবিটিকে তিনি একটি আস্থা-বিনিময় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই তহবিল ছাড় দিলে তা ইরান ও আমেরিকার ভবিষ্যতের জন্য ‘নতুন দিগন্ত’ উন্মোচন করবে। মহসেন রেজাই বলেন, ‘ট্রাম্প যদি ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে চান, তবে এই ২৪ বিলিয়ন ডলার হলো ট্রাম্পের প্রতি ইরানের আস্থা রাখার একটি পরীক্ষা। এটি এমন একটি পরীক্ষা যেখানে আমেরিকাকে পাস করতে হবে এবং তাহলেই পথ উন্মুক্ত হবে। এটি আমাদের নিজস্ব টাকা, আমেরিকার টাকা নয়।’

পুনরায় যুদ্ধ শুরুর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি: মহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার সংঘাত শুরু করে, তবে ইরান যুদ্ধকে পারস্য উপসাগরের বাইরেও টেনে নিয়ে যাবে। এর ফলে সামরিক অভিযান হরমুজ প্রণালি থেকে ভারত মহাসাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত যেসব মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে আসছি, সেগুলোর বাইরে অন্য ঘাঁটিতে আক্রমণ করে যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেব।’

তবে একই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা কম।’

ট্রাম্প খামেনির সম্ভাব্য বৈঠক: সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা নিয়ে করা প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন রেজাই । তিনি বলেন, ‘এমনটি ঘটবে না। বর্তমানে আমরা আলোচনার প্রথম পর্যায়ে আছি এবং মিস্টার ট্রাম্প আলোচনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন। এই বৈঠক হবে না।’

উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন খামেনির সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক বজায় রয়েছে বলে মনে হচ্ছে এবং তার সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন।

হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি: মহসেন রেজাই বলেন, ইরান এবং ওমানের এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর সার্বভৌমত্ব রয়েছে, যেখান দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হতো। তাই তারা যৌথভাবে এটি পরিচালনা করবে। তবে জাহাজ চলাচলের জন্য ফি নেওয়ার বিষয়টিকে ‘টোল’ বা খাজনা বলতে রাজি নন তিনি।

তিনি জানান, ইরান এটিকে রক্ষণাবেক্ষণ ফি হিসেবে নেবে, কারণ সমুদ্রপথ ব্যবস্থাপনার খরচ একা ইরানের বহন করা উচিত নয়।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পুরোনো প্রজন্মের সদস্য মহসেন রেজাই ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে এটিকে দেশের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখেন। একজন কট্টরপন্থি বাস্তববাদী হিসেবে তিনি পরবর্তীতে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলে যোগ দেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়ী হতে পারেননি।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে শুরু হওয়া ৪০ দিনব্যাপী মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের সময় ইরান আঞ্চলিক ১২টি দেশের সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক সাইটগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল। এমনকি ইরান তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য প্রায় ২ হাজার মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যৌথ মার্কিন-যুক্তরাজ্য সামরিক ঘাঁটি ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল বলে জানা গেছে।

সাক্ষাৎকারে মহসেন রেজাই ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো পারমাণবিক চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি ২০১৫ সালের চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়া এবং আলোচনায় তার ‘অস্পষ্টতা’র কৌশলের কথা উল্লেখ করেন।

আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আক্রমণ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে মহসেন রেজাই বলেন, ‘যদি আমাদের ভূখণ্ডে আক্রমণ হয়, তবে বিশ্ব ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে পারবে। কারণ আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ল্যান্ড পাওয়ার বা স্থল শক্তি বহুগুণ বেশি।’

তিনি চলমান এই যুদ্ধকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে শত্রুদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রথম বিজয় হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘ইতিহাসে এবারই প্রথম ইরান যুদ্ধে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলোতে ইরান সবসময় পরাজিত হয়েছিল।’

সূত্র: সিএনএন

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন