ইহুদিদের সবচেয়ে বড় শত্রু জায়নবাদীরা!

ইহুদিদের সবচেয়ে বড় শত্রু জায়নবাদীরা!

জায়নবাদ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ফিলিস্তিনে জাতিগত নিধন, অশেষ যুদ্ধ, বর্ণবাদ এবং জমি দখলের মতো নানা অভিযোগে বরাবরই কাঠগড়ায় উঠেছে এই ভাবাদর্শ। তবে এই আন্দোলনের একটি অন্ধকার ও কম জানা দিক উন্মোচন করেছেন লেখক জস শেলডন। তার নতুন বই ‘দ্য জায়নিস্টস হু হেট জিউস’-এ তিনি দাবি করেছেন, যে জায়নবাদ বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের সুরক্ষার জিকির তোলে, ইতিহাসজুড়ে সেই আন্দোলনের শীর্ষনেতারাই আসলে ইহুদিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে এসেছেন।

বইটির শুরুতেই শেলডন লিখেছেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ইসরায়েলকে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ বা ইহুদিদের স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেভাবে প্রচার করা হয়েছে, তা একটি সাজানো গল্প। বছরের পর বছর এই অসত্য প্রচার করতে করতে সাধারণ মানুষের মনে এটি স্থান করে নিয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

৩০০ পৃষ্ঠারও বেশি আয়তনের ১১টি অধ্যায়ে বিস্তৃত এই বইয়ে লেখক টম সেগেভ, অ্যাভি শ্লাইম ও এলা শোহাটের মতো বিখ্যাত ইতিহাসবিদদের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে জায়নবাদী নেতারা তাদের অপছন্দের ইহুদিদের অপমান করেছেন, বিশ্বখ্যাত ইহুদি-বিদ্বেষীদের সাথে হাত মিলিয়েছেন এবং সাধারণ ইহুদিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। লেখকের মতে, ‘জায়নবাদ এবং ইহুদি-বিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’

প্রতিষ্ঠাতাদের মনেই ছিল ইহুদি-বিদ্বেষ

বইটিতে উঠে এসেছে রাজনীতিভিত্তিক জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেলের কথা। হার্জেল মনে করতেন সাধারণ ইহুদিরা ‘মেরুদণ্ডহীন, অবদমিত ও নোংরা’। যেসব ইহুদি তার এই আন্দোলন প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের জন্য তিনি অত্যন্ত অপমানজনক বর্ণবাদী গালি ব্যবহার করতেন।

একইভাবে আধুনিক জায়নবাদের অন্যতম পথিকৃৎ জেভ জাবোটিনস্কি সাধারণ ইহুদিদের ‘কুৎসিত, রুগ্‌ণ ও ভীতু’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। লেবার জায়নবাদের ভাবাদর্শী মোসেস হেস ইউরোপের অভিবাসী ইহুদিদের ‘পরজীবী’ বলে আখ্যা দেন। লেখকের মতে, নিজেদের জাতিকে আগে নিচু চোখে দেখা এবং পরে তার ‘সমাধান’ হিসেবে একটি আলাদা ইহুদি রাষ্ট্রের লোভ দেখানোই ছিল এই আন্দোলনের মূল কৌশল।

১৯ শতকের বিশিষ্ট ইহুদি বুদ্ধিজীবীরাও এই চক্রান্ত বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৯৮ সালে বিখ্যাত ইহুদি লেখক কার্ল ক্রাউস হার্জেলের এই আন্দোলনকে ‘ইহুদিদের নিজস্ব ইহুদি-বিদ্বেষ’ বলে সতর্ক করেছিলেন।

চরম ইহুদি-বিদ্বেষীদের সঙ্গে আঁতাত

জায়নবাদী নেতাদের এই মনোভাব কেবল কথার কথা ছিল না। থিওডোর হার্জেল বিশ্বাস করতেন, ইউরোপের ইহুদি-বিদ্বেষী সরকারগুলোকেই তারা নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। কারণ ওই সরকারগুলোও চাইত ইহুদিরা ইউরোপ ছেড়ে চলে যাক। ফলে তৎকালীন কায়জার উইলহেম কিংবা আর্থার বেলফোরের মতো ইহুদি-বিদ্বেষী নেতাদের সাথে জায়নবাদীরা মিত্রতা গড়ে তোলে। লেখক দেখিয়েছেন, দুই পক্ষের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও মূল লক্ষ্য ছিল এক—ইউরোপ থেকে ইহুদিদের অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়া।

হোলোকস্ট ও ঐতিহাসিক প্রতারণা

বইটির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের দ্বারা সংঘটিত ইহুদি গণহত্যা বা ‘হোলোকস্ট’ সংক্রান্ত অধ্যায়টি।

১৯৪৪ সালে হাঙ্গেরির ইহুদিদের যখন আউশউইচ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছিল, তখন পালিয়ে আসা দুই বন্দির তথ্যে গণহত্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই তথ্য পৌঁছেছিল হাঙ্গেরীয় জায়নবাদী কর্মকর্তা রুডলফ কাস্টনারের কাছে। কুখ্যাত নাৎসি অফিসার অ্যাডলফ আইখম্যান পরবর্তীতে জানান, কাস্টনারের সাথে তাদের একটি চুক্তি হয়েছিল—কাস্টনার সাধারণ ইহুদিদের নাৎসিদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে বাধা দেবেন, আর বিনিময়ে নাৎসিরা কাস্টনারের পরিবার ও নির্দিষ্ট কিছু ‘কাজের উপযোগী’ ইহুদিদের প্রাণভিক্ষা দেবে। ফলে সাধারণ ইহুদিরা কোনো সতর্কবার্তা পায়নি এবং লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

ইহুদিদের রক্ষার চেয়ে নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনকেই মূল প্রাধান্য দিয়েছিলেন তৎকালীন জায়নবাদী নেতারা। ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন ১৯৩৩ সালে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘ইহুদিদের বাঁচানোর চেয়ে জায়নবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ এমনকি ১৯৩৮ সালে নাৎসিদের ভয়াবহ হামলার পরও তিনি মন্তব্য করেছিলেন, পুরো জার্মানির ইহুদি শিশুদের বাঁচিয়ে ব্রিটেনে পাঠানোর চেয়ে তাদের অর্ধেককে ফিলিস্তিনে পাঠাতে পারাটা বেশি আনন্দের, কারণ সেখানে একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রশ্ন জড়িত।

জস শেলডনের এই নতুন বইটি জায়নবাদের পেছনের মূল উদ্দেশ্য এবং এর ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন