আমেরিকা ও ইরানের চলমান সংঘাত বন্ধে ইসলামাবাদে মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক একদিকে যেমন যুদ্ধবিরতির সেরা সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের প্রভাব সীমিত করার প্রাথমিক ধাপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
যদিও এই চারটি দেশ এর আগেও জোটবদ্ধভাবে আলোচনায় বসেছে। তবে, গত রোববার বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বন্ধ করা এবং আমেরিকা ও ইরানকে যুদ্ধবিরতির জন্য রাজি করানো।
ক্রাইসিস গ্রুপের উপসাগরীয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন ফারুকের মতে, চার দেশের এই দল যুদ্ধবিরতিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। কেননা এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনাও করছে।
তিনি আরো বলেন, এটি সত্যিই একটি দুঃস্বপ্ন। উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুর দিকে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরিস্থিতি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কেননা তাদের পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে বড় পরিসরে হামলা চালানো হলে তা উপসাগরীয় দেশগুলোতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে।
এদিকে গত রোববার ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এই চুক্তি যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ইসলামাবাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
সেই আলোচনার পর ইসলামাবাদ ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। যাতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার পথ খোলা থাকে। ইরানও এই চ্যানেলকে নির্ভরযোগ্য বলছে।
যুদ্ধ বন্ধে চার দেশের এক টেবিলে আলোচনা করাটা অনেকের কাছে বিস্ময়ের। কেননা অনেক প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতোই গোপনে ইরানকে ধ্বংস করতে আমেরিকাকে উৎসাহ দিচ্ছে। তবে এ যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ থেকে বোঝা যাচ্ছে, সৌদি আরব নিজেদের জন্য বিকল্প পথ খোলা রেখেছে।
ইয়াসমিন ফারুক বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সব বিকল্পই ব্যয়বহুল। তারা চায়, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় হামলা এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণ দিক।
ইসলামাবাদের এ আলোচনায় কাতারের কোনো প্রতিনিধি নেই। যারা তুরস্কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কেননা, কাতার এখনো রাশ লাফান লিকুইড গ্যাস সুবিধায় হামলাকে ইরানের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছে। এক বিশ্লেষক বলেছেন, দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো নয়। তারা যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে, কিন্তু ইরানের হয়ে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চাইছে না।
এই জোটের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এর সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় দেশ হলো তুরস্ক। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নয়, বরং পুরো অঞ্চলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রক্সি গ্রুপের সমর্থন নিয়ে আলোচনা চালানোর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে।
তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক ইব্রাহিম কালিন বলেন, এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং আরো বিপজ্জনক কিছু। এটি দীর্ঘ মেয়াদে কুর্দি, তুর্কি, আরব ও পারসিয়ানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বের পথ প্রশস্ত করবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা জানি কারা এ যুদ্ধ শুরু করেছে। তারা লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য স্থান ধ্বংস, দখলের নীতি অনুসরণ করে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা করছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ভুলতে পারি না, এ যুদ্ধের দায় কাদের।
গত শুক্রবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরাইলের লক্ষ্য মুসলিম দেশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করা, যাতে তারা ইরানবিরোধী জোটকে বিস্তৃত করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চল ধাপে ধাপে ইসরাইলের দাবার গুটিতে পরিণত হচ্ছে।
তিনি যুক্তি দেন, আমেরিকার জনগণ যুদ্ধ চায় না। ট্রাম্প এখন যুদ্ধের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে আমেরিকার রাজনীতিতে একটি কাঠামোগত সমস্যা হলো, ইসরাইলের ওপর চাপ দেওয়ার কোনো কার্যকর পন্থা নেই।
তিনি আরো বলেন, যদি আমেরিকা ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তবে তাদের ইসরাইলের ওপর অত্যন্ত কঠোর প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দিনশেষে দেখার বিষয় কে কার ওপর বিজয়ী হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

