যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিনই ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

বিবিসি বাংলা

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিনই ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শর্ত সাপেক্ষে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই বুধবার লেবাননে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরাইল। এতে অন্তত ১৮২ জন নিহত হন। জবাবে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে রকেট নিক্ষেপ করেছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি জানিয়েছে, ইসরাইল যদি লেবাননের ওপর হামলা অব্যহত রাখে, তাহলে প্রতিপক্ষকে 'পস্তাতে হয় এমন জবাব' দেবে তারা।

এমন অবস্থায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় তারা উত্তর ইসরাইলে রকেট নিক্ষেপ করেছে।

ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠী সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, লেবাননের বিরুদ্ধে 'ইসরাইলি-আমেরিকান আগ্রাসন' বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা হামলা চালিয়ে যাবে।

এর আগে, স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পরে তা নিশ্চিত করে ইসরাইল, ইরান ও চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান।

লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরাইল

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই বুধবার লেবাননে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরাইল, এতে অন্তত ১৮২ জন নিহত হয়েছে।

এখন লেবাননে চলমান হামলায় যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এছাড়া, লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

বুধবার মাত্র ১০ মিনিটে লেবাননের ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরাইল।আর হামলা বন্ধ না হলে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়েছে ইরান।

লেবাননকে 'পৃথক সংঘাতের' বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইসরাইল ইরানসংক্রান্ত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করছে না।

প্রসঙ্গত, গত ছয় সপ্তাহে লেবাননে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৩০।

আর বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।

এদিকে, এই হামলাকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হিজবুল্লাহর ওপর 'সবচেয়ে বড় আঘাত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

তিনি বলেন, 'প্রয়োজন হলে' ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে আবার লড়াই শুরু করবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানে হামলা ও শাসনব্যবস্থা পতনের যৌথ উদ্যোগে রাজি করিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করেছেন বলে ধরেই নিয়েছিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

তবে, তেহরানে হামলা বন্ধ করার বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি যে শেষ মুহূর্তে অবগত হয়েছেন, এ ধরনের দাবি আজ তাকে অস্বীকার করতে হয়েছে।

তিনি শপথ করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে ইসরাইল আবারও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত থাকবে।

দেশটির বিরোধী রাজনীতিবিদরা বলছেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। তাকে আলোচনার টেবিলে ডাকা হয়নি আর তার পদক্ষেপ ইরানকে আরও বেশি প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছে।

এর ফলে ইরান এখন আগের চেয়ে বেশি দৃঢ়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আগ্রহী হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

তবে, স্বল্পমেয়াদে চিন্তা করলে, লেবাননে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের অব্যাহত হামলা আর এর ফলে হওয়া প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

যুদ্ধবিরতির তিনটি ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে: ইরান

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, তেহরানের দেয়া যুদ্ধবিরতি ১০ দফা প্রস্তাবের তিনটি ধারা ইতোমধ্যেই 'প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত' হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা চালিয়ে যাওয়াকে 'অযৌক্তিক' বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

মি. গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে লেবানন অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস।

তিনি আরও বলেছেন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের ফার্স প্রদেশে একটি ড্রোন প্রবেশ করেছিল।

যদিও, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ বিবিসিকে বলেছে, তারা এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে 'অবগত নয়'।

তৃতীয়ত, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের বিষয়টিও প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানান গালিবাফ।

আর ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এসএনএসসি'র ফারসি বিবৃতিতেও একই কথা বলা হয়, যা গত রাতে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের উপস্থাপক পাঠ করে শোনান।

পাকিস্তানে যাবেন জেডি ভান্স

এদিকে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির ১০ দফা নিয়ে ১০ই এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেয়ার কথা রয়েছে।

দুই পক্ষের আলােচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগরের নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত করা।

ইতিমধ্যে ইরান জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া এ পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে 'লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ধ্বংস করা হবে'।

তবে, জেডি ভ্যান্স বলছেন, এ ধরনের চুক্তিতে কিছুটা 'অস্থিরতা' থাকেই।

হরমুজে কি জাহাজ চলছে?

এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে কতগুলো জাহাজ চলাচল করতে পারছে, তা স্পষ্ট নয়।

সংকীর্ণ এ সমুদ্রপথটি আসলেই কতটা খোলা রয়েছে, তা নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, লেবাননে ইরানের মিত্রদের ওপর ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলার পর প্রণালিটি এখনও বন্ধ রয়েছে।

ইরানের দুটি গণমাধ্যম একটি জাহাজ-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা গেছে পানামা পতাকাবাহী একটি জাহাজ প্রণালির দিকে এগিয়ে গিয়েও পরে ফিরে গেছে।

তারা ক্যাপশনে লিখেছে, "হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।'

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট তার ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রণালি বন্ধ থাকার যেকোনো খবর ভুয়া, বরং সেখানে জাহাজ চলাচল "বেড়েছে"।

লেভিট আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব "অগ্রহণযোগ্য" ভুয়া প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত আছেন এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন যে পথটি বাস্তবে খোলা রয়েছে।

এদিকে, বাণিজ্যিক জাহাজ ব্রোকার এসএসওয়াই বিবিসি ভ্যারিফাইকে ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড আইআরজিসি'র কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এতে বলা হয়েছে, "হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ রয়েছে এবং এই পথে চলাচলের জন্য বিপ্লবী গার্ডের অনুমতি প্রয়োজন।

অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ধ্বংস করা হবে।"

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...