ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ ঘোষণা ট্রাম্পের

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ ঘোষণা ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই দেশের মধ্যে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত বন্ধে আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই ইরান চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ ঘোষণার কথা জানান। পোস্টে তিনি বড় হাতের অক্ষরে নিজের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এ ঘোষণা দেন।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তির সুযোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে দেশটিকে ‘নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার’ মুখে পড়তে হবে।

ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে এমন যেকোনো দেশকেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, কোনো দেশ যদি তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়, তাহলে ওই দেশও ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির’ মুখে পড়বে।

তেল চোরাচালান, পণ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র, জাহাজ নিবন্ধন এবং ইরানের হয়ে কাজ করা ভুয়া কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, এটি হবে একটি ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’। ইরানের হুমকি মোকাবিলা এবং দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পাশে থাকার আহ্বানও জানান তিনি।

তবে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। গত এপ্রিল থেকে তার প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের অভিযান চালিয়ে আসছে। এর লক্ষ্য হলো তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির আয়ের উৎস বন্ধ করা।

ইতোমধ্যে ইরানের তেল, নৌপরিবহন ও আর্থিক খাতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জ্বালানি রপ্তানি থেকে ইরানের আয় বন্ধ করাই এসব নিষেধাজ্ঞার অন্যতম লক্ষ্য।

এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তেল বিদেশে বিক্রিতে সহায়তার অভিযোগে বিভিন্ন কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও ট্যাংকারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

‘হতাশা’ প্রকাশ পাচ্ছে ট্রাম্পের বক্তব্যে

ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইরান সরকার। তবে দেশটির গণমাধ্যম নতুন ঘোষণাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেছে, ট্রাম্পের ঘোষণা নতুন কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করার চেষ্টা করছে।

তাসনিম বলেছে, ইরান এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার পদ্ধতি শিখেছে এবং তা করতে তারা যথেষ্ট দক্ষ হয়ে উঠেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, সামরিক আগ্রাসন ব্যর্থ হওয়ার পর এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার করা ‘বিভ্রান্তিকর’ দাবির মধ্যে ট্রাম্প এখন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরুর কথা বলছেন।

ওয়াশিংটন থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক মাইক হান্না বলেন, ট্রাম্পের সর্বশেষ পোস্টে এক ধরনের হতাশার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইরানের ওপর ইতোমধ্যে যেসব অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, তার বাইরে ট্রাম্প আর কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।

তার মতে, ট্রাম্প কী পদক্ষেপ নিতে চান, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় এর স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

হান্নার মতে, ইরানিদের কাছে এটি আরেকটি হুমকি বলেই মনে হতে পারে। তবে ট্রাম্পের লক্ষ্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও হতে পারে। কারণ দেশটির একটি অংশ এখনো চলমান সংঘাতের বিরোধিতা করছে। তাই নির্দিষ্ট পদক্ষেপের তথ্য না থাকলেও জনসমক্ষে নিজের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরতে ট্রাম্প এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন।

চীনকে লক্ষ্য করার চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্প ইরানের পাশাপাশি চীন, ইরাক ও তুরস্কের ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন।

ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবি বলেন, চীনে ইরানের তেল কেনে এমন ছোট স্বাধীন তেল শোধনাগার বা ‘টিপট রিফাইনারি’কে সেবা দেওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করতে পারেন ট্রাম্প। ইরানের তেল কেনার ক্ষেত্রে এসব শোধনাগারই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা।

তবে এতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। হাবিবি বলেন, চীন সরকার দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় সহযোগিতা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্য আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল কেনা শোধনাগারগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাকারী চীনা প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে, তাহলে চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইরানের সঙ্গে তুরস্ক, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার স্থলপথে বাণিজ্যের ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করেন হাবিবি।

তার মতে, এসব সীমান্তে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারের ব্যবস্থাপনা প্রধান ব্রেট এরিকসন বলেন, যেসব পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি, তার পেছনে ঝুঁকি রয়েছে।

তার মতে, এসব পদক্ষেপে যদি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ঝুঁকির তুলনায় লাভ বেশি থাকত, তাহলে সেগুলো এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করা হতো।

এরিকসন বলেন, চীনের ব্যাংকগুলোই ট্রাম্পের হাতে থাকা সবচেয়ে কার্যকর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার। তবে এসব ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এমনকি তাতেও যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর নিশ্চয়তা নেই।

তার মতে, অর্থনৈতিক চাপ থেকে দ্রুত ফল পেতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কার্যকর উপায় কম। তবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বড় সিদ্ধান্ত।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন