অনেক অনেক দিন আগের কথা। গ্রিক পুরাণে রাজা মাইডাসের এক ভয়ংকর আশীর্বাদের গল্প বলা হতো। তিনি যা ছুঁতেন, তাই সোনা হয়ে যেত। প্রথমে মনে হয়েছিল, এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সেই সৌভাগ্যই অভিশাপে রূপ নিল। খাবার ছুঁলেই সোনা, ফল ছুঁলেই সোনা। পানির পেয়ালা ঠোঁটে তোলার আগেই সেটাও সোনা। শেষে তিনি বুঝলেন, সবকিছু সোনা হয়ে গেলে জীবন বাঁচে না, জীবন পুড়ে যায়। আজকের মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে সেই পুরোনো গল্পটাই আবার ফিরে আসে। কারণ হোয়াইট হাউসে বসে ডোনাল্ড ট্রাম্পও যেন এক ধরনের নতুন মাইডাস হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার ছোঁয়ায় সোনা ফলছে না, তার ছোঁয়ায় জ্বলে উঠছে যুদ্ধ। তার স্পর্শে পুরোনো ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। মিত্ররা শিউরে উঠছে। শত্রুরা আরো ক্ষিপ্ত হচ্ছে।
গাজার মাটিতে ফিলিস্তিনিদের রক্ত তখনো শুকোয়নি। সেই রক্তের দাগের মধ্যেই মাত্র আট মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আমেরিকা আর ইসরাইল। এবারের আঘাত ছিল আরো গভীর, আরো সরাসরি, আরো বিধ্বংসী। হামলায় প্রাণ গেল ইরানে রাহবার নামে পরিচিত দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শাসনব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়ের অনেকের।
ওয়াশিংটন, তেল আবিব আর নির্বাসিত শাহ পরিবারের উত্তরাধিকারীদের কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিল, এবার তেহরানে শাসক বদলের ঢেউ উঠবে, ইরানের মানুষ রাস্তায় নামবে উল্লাসে। কিন্তু ইরানের শহরগুলো অন্য দৃশ্য দেখল। তেহরান, মাশহাদ, ইস্পাহান, তাবরিজ, শিরাজ, কেরমানশাহ জুড়ে মানুষ রাস্তায় নামল ঠিকই; কিন্তু আনন্দে নয়, শোকে-ক্ষোভে। তাদের চোখে পানি। চোয়াল শক্ত। হাত মুষ্টিবদ্ধ। সেই মুখগুলো দেখে মনে পড়ে বাংলার এক পুরোনো পঙ্ক্তি—আমার রক্তে যেন লেখা হয় তাদের সর্বনাশ। আজ ইরানের রাস্তায় রাস্তায় যেন সেই প্রতিজ্ঞারই প্রতিধ্বনি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের অধ্যাপক ইউজিন রোগান। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে তার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে, যার শিরোনাম ‘ট্রাম্পস ওয়ার অন ইরান ইজ স্প্রেডিং : হোয়্যার ডাজ ইট স্টপ?’ এ লেখায় তিনি বর্তমানের এই ভয়াল সময়টাকে ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টা করেছেন। রোগান শুধু চার দেয়ালের তাত্ত্বিক গবেষক নন; মধ্যপ্রাচ্যের ধুলোবালিমাখা দীর্ঘ ইতিহাস, একের পর এক সাম্রাজ্যের পতন, কৃত্রিম সীমান্তের জন্ম আর আরব জাতীয়তাবাদের উত্তাল দিনগুলো তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ওসমানিয়া বা অটোমান সাম্রাজ্যের ভাঙন থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের প্রতিটি রক্তমাখা মোড় তার নখদর্পণে। ‘দ্য অ্যারাবস : আ হিস্ট্রি’ কিংবা ‘দ্য দামাস্কাস ইভেন্টস’-এর মতো কালজয়ী বইগুলো তাকে এই জনপদের এক অনন্য ভাষ্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই ইউজিন রোগান বলেন, এই যুদ্ধ শুধু কোনো সামরিক মহড়া বা অভিযান নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রটাকে নতুন করে ধুয়েমুছে লিখে দেওয়ার এক সুগভীর নীলনকশা। তার সেই সতর্কবার্তাকে তখন এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য কারোরই নেই।
একবিংশ শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্য যে সহিংসতার পর সহিংসতা দেখেছে, তা অনেক অঞ্চলের কয়েক শতকের ইতিহাসের সমান। নাইন-ইলেভেন বা নয়-এগারোর ছুতা ধরে শুরু হয়েছিল তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তারপর ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণ গোটা অঞ্চলের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর যে নতুন ইরাক গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার বদলে জন্ম নেয় ভাঙা রাষ্ট্র, গৃহদ্বন্দ্ব আর সংঘাত। এরপর একে একে লিবিয়ায় রাষ্ট্র ভেঙে যায়, সিরিয়া আগুনে জ্বলে। ইয়েমেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সুদানও গৃহযুদ্ধের নরকে নেমে যায়। তারপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরাইলকে কাঁপিয়ে দেয়। তার জবাবে গাজায় শুরু হয় এমন এক যুদ্ধ, যার অভিঘাত সীমান্ত মানেনি। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত ইরানও এই আগুনের বাইরে থাকতে পারেনি। একের পর এক ধাক্কায় মধ্যপ্রাচ্য যেন এমন এক ভূমিকম্পময় অঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যেখানে মাটি যেমন কাঁপে, তেমনই কাঁপে রাজনীতি, জোট ও আস্থা আর মানুষের ভবিষ্যৎ।
এই পটভূমিতে ২০২৬ সালে এসে মধ্যপ্রাচ্যের অনেকে যখন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার বাসনায় অস্থির, তখন ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা আর ইসরাইল মিলিতভাবে ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালাল। অভিযানের সাংকেতিক নাম দেওয়া হলো অপারেশন এপিক ফিউরি। মহাকাব্যিক রোষ। এ নামের মধ্যেই ছিল শক্তির প্রদর্শন। কিন্তু তার ফল হলো শুধু ইরানে বিস্ফোরণ নয়, গোটা অঞ্চলে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ। কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অন্তত আটটি দেশ এই সংঘাতের আগুনে জড়িয়ে পড়ল—কেউ স্বেচ্ছায় নয়; বরং অবস্থানের কারণে, মার্কিন ঘাঁটির কারণে, কিংবা নিছক জোটের কারণে তারা লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেল। যুদ্ধ এখন কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ জানে না। তবে একটি কথা প্রায় নিশ্চিত। এই যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক—তার পরের মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মধ্যপ্রাচ্য থাকবে না।
আক্রমণটি একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অপ্রত্যাশিতও ছিল না। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি আমেরিকা ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একটি নিশানানির্ভর সামরিক অভিযান চালায়। তাতে গ্রেপ্তার করা হয় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। সেই অভিযানের পর ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন নৌবহরের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তখন থেকেই অনেকে বুঝেছিল, ট্রাম্পের নজর এবার কোন দিকে। কিন্তু ইরানে যা হলো, তা ভেনেজুয়েলার পুনরাবৃত্তি নয়। সেখানে আমেরিকা শুধু মাদুরোকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, রাষ্ট্রকাঠামো ভাঙেনি। কিন্তু ইরানে প্রথম আঘাতেই নিহত হলেন সর্বোচ্চ নেতা এবং তার ঘনিষ্ঠ শাসনব্যবস্থার কয়েকজন মুখ্য ব্যক্তি। এই হামলা ছিল শুধু দমন নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ভূকম্পন সৃষ্টি করার চেষ্টা। আর তা করা হলো ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে। যেন এক সুপারপাওয়ার আর তার আঞ্চলিক চৌকিদার মিলে নতুন করে গোটা অঞ্চল সাজাতে বসেছে। এর আগেই তেল আবিবকে তেলের পুলিশ হিসেবে গড়ে তোলার সব কোশেশ করা হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর খুব স্বাভাবিকভাবেই শাসক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ সামনে আসে। হামলার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে আহ্বান জানান নিজেদের সরকার নিজেরাই দখল করে নিতে। তার কথার সুর ছিল স্পষ্ট। তিনি যেন ইরানিদের বলছিলেন, ‘এই তো সময়, এই সুযোগ আর নাও আসতে পারে।’ কিন্তু ইতিহাস শেখায়, বাইরে থেকে ছুড়ে দেওয়া এমন ডাক ভেতরের সমাজে একভাবে ধরা পড়ে না। অনেক সময় তা সুযোগের ডাকের চেয়ে অপমানের ডাক হিসেবে বেশি শোনা যায়। বিশেষ করে যে দেশে বিদেশি হস্তক্ষেপের স্মৃতি দীর্ঘ, যে দেশে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের ইতিহাস এখনো ইরানের জাতীয় স্নায়ুতে টিকে আছে, সেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের এমন আহ্বান মুক্তির পথের চেয়ে সন্দেহের আগুনই বেশি জ্বালায়।
এর পরের দিনগুলোয় ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি আরো বদলাতে থাকে। কখনো বলা হলো, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের দোরগোড়া থেকে ফেরানোই মূল লক্ষ্য। কখনো বলা হলো, ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি ধ্বংস করতে হবে। আবার কখনো যুদ্ধের উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা হলো ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক—হিজবুল্লাহ, হুতি ও হামাসকে ভেঙে দেওয়ার কথা। আরেক পর্যায়ে ট্রাম্প ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংসের কথাও বলেন। এর মানে দাঁড়ায়, এই যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্য একটিতে আটকে নেই; বরং এটি সামরিক, কৌশলগত, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার এক অল-আউট প্যাকেজ অভিযান।
সামরিক হিসেবে আমেরিকা আর ইসরাইলের আকাশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রবল। তারা চাইলে ইরানের পরমাণু স্থাপনা, মিসাইল ঘাঁটি, রাডার নেটওয়ার্ক ও বন্দরগুলোর ওপর পদ্ধতিগত হামলা চালাতে পারে। সমুদ্রে ভাসমান যুদ্ধজাহাজ, যেমন ফ্রিগেট আইআরআইএস ডেনার মতো জাহাজগুলো বিমান হামলা বা সাবমেরিনের টর্পেডোর সামনে বেশ ঝুঁকিতে থাকে। তবু যুদ্ধ যত এগিয়েছে, শাসক পরিবর্তনের ভাষা ততটা জোরে শোনা যায়নি। এর পেছনে আমেরিকার নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতাও আছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছেন, তিনি ইরাক আর আফগানিস্তানের মতো অনন্ত যুদ্ধ চান না। আমেরিকার ভোটারদের বড় অংশও বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ সামরিক অভিযান পছন্দ করে না। ইরাক আর আফগানিস্তানে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মার্কিন পরীক্ষা সফল হয়নি। এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বড় ধরনের রাষ্ট্র নির্মাণ প্রকল্পকে নিরুৎসাহিত করে। তাই সরাসরি শাসক বদলের কথা বলা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
রাজনীতি এক কথা, ক্ষমতার কক্ষের ভেতরের প্রলোভন আরেক কথা। যুদ্ধের আগে ওয়াশিংটনে এমন ভাবনা ছিল যে, ইরানে যদি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার বসানো যায়, তবে আমেরিকার তেলের ব্যবসা নতুন সম্ভাবনা পাবে। কিন্তু ৪৭ বছরের শত্রুতা আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর থেকে এমন কাউকে বের করা সহজ নয়, যিনি প্রকাশ্যে আমেরিকার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হবেন।
এই কারণেই নির্বাসিত রাজপরিবারের প্রসঙ্গ সামনে আসে। শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলবির ছেলে রেজা পাহলবিকে নিয়ে রাজতন্ত্রপন্থিরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লব শুধু একটি শাসকের পতন ছিল না; ছিল রাজতান্ত্রিক দমনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরিত ক্ষোভ। ফলে বহু ইরানির কাছে পাহলবি পরিবার মানে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নয়, বরং অন্ধকার অতীতের প্রতীক। এমনকি ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, রেজা পাহলবির নিজের দেশে কতটা ভিত্তি আছে, তা তিনি জানেন না।
পাহলবির মতো দুর্বল বিকল্প সামনে রেখে ইরানে নতুন নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তখন প্রশ্ন আসে, আমেরিকা আর ইসরাইল ইরানের বর্তমান সরকারকে যথেষ্ট দুর্বল করলে কি জনগণ বিদ্রোহ করবে? ইতিহাস বলে, বিদেশি আক্রমণ বহু সময় ভেতরের অসন্তোষকে স্তব্ধ করে দেয় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে জাতিগত একতা ফিরিয়ে আনে। ইরানেও তাই ঘটতে চলেছে। তাছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এবং বাসিজ বাহিনী এখনো রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ। পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের মতে, সাম্প্রতিক দমনপীড়নে ৭ থেকে ১০ হাজার মানুষ নিহত হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো অটুট। এমন এক শক্তির সামনে বিদেশি হামলার মুখে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা খুবই কম।
যুদ্ধের আগুন শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমেরিকার বন্ধুদেরও বিপদে ফেলছে। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা। তাদের জন্য নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার শর্ত। বর্তমান সংঘাত সেই শর্তকেই উড়িয়ে দিয়েছে। কুয়েত, ওমান আর কাতার ঐতিহাসিকভাবে তেহরানের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। সৌদি আরবও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করেছিল। এই রাষ্ট্রগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে বারবার বলেছিল যেন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়; কারণ যুদ্ধ মানেই আঞ্চলিক প্রতিশোধ, জ্বালানি বাজারে আতঙ্ক, বন্দরজট আর পর্যটনে ধস।
এই আশঙ্কাগুলো এখন নির্মম সত্য। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পরের দিনগুলোয় ইরান হাজার হাজার স্বল্পমূল্যের ড্রোন আর মিসাইল ছুড়েছে। বাহরাইন আর এরবিলে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। দুবাই আর আবুধাবির আবাসিক ভবন ও কূটনৈতিক স্থাপনাও রক্ষা পায়নি। সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল টার্মিনাল ইরানি ড্রোন আঘাতে বন্ধ হয়ে যায়। এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। আকাশ প্রতিরক্ষা মজুত দ্রুত কমে আসছে এবং সস্তা ড্রোন ঠেকাতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করা আরবের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এই ভারসাম্য যত ভাঙছে, ক্ষতির আশঙ্কা তত বাড়ছে।
ইসরাইলের ভূমিকাও আরব মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। উপসাগরীয় মহলে আশঙ্কা—ইরান দুর্বল হলে ইসরাইল এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তার করবে। তাছাড়া গাজার যুদ্ধ তো থামেইনি, উল্টো ইরান যুদ্ধের ডামাডোলে ফিলিস্তিনিদের আর্তনাদ হারিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হাতে শয়ে শয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রায় ২০ লাখ মানুষ এখন গাজার মাত্র ৪৭ শতাংশ এলাকায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরাইল গাজায় প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দেয়, যা মানবিক পরিস্থিতিকে আরো সংকটে ফেলেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, এই সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে, তবে তা দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনিশ্চয়তাই এখন একমাত্র নিশ্চিত বিষয়। ইরান বড় আঘাত খেয়েছে ঠিকই, কিন্তু খামেনির মৃত্যু সত্ত্বেও দেশটি ভেঙে পড়েনি। এটি এক জটিল প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। বাইরের শক্তি আকাশপথে হামলা চালিয়ে হয়তো অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু একটি বিপ্লবী আদর্শের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে উপড়ে ফেলা সহজ নয়। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ধাক্কা খাবে এবং ইরান আরো অপ্রথাগত বা সাইবার হামলার পথে হাঁটতে পারে।
মাইডাসের গল্পে শেষ পর্যন্ত সোনার জৌলুস ভেঙে অভিশাপ বেরিয়ে এসেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের আজকের দগদগে প্রান্তরেও সেই সত্যই দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের স্পর্শে সোনা হয়নি, আগুন হয়েছে; আর সেই আগুন কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো কেউ জানে না। কোথাও শোকমিছিল, কোথাও মিসাইল সতর্কতা আর কোথাও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ভবিষ্যৎ—এই হলো বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের ছবি। শুরুতে যে আগুনের ঝলক দেখা গিয়েছিল, শেষে এখন সেই আগুনই দাউ দাউ করে পুড়িয়ে দিচ্ছে আস্ত এক জনপদকে।
লেখক : সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

