বিশ্বকাপ ফাইনাল

আর্জেন্টিনা-স্পেনের ম্যাচে ফিলিস্তিন-ইসরাইলের লড়াই

আর্জেন্টিনা-স্পেনের ম্যাচে ফিলিস্তিন-ইসরাইলের লড়াই
ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে সংহতিই প্রকাশ করেছেন লামিন ইয়ামেল (বামে), জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালে বার্সেলোনা ফুটবল দলের সাথে লিওনেল মেসি (ডানে)।

রোববার দিবাগত রাত ১টায় আমেরিকাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের বিশ্বকাপ ফাইনালটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশ দুটির বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এটি একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বা পরোক্ষ লড়াই হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে । ম্যাচটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

খেলোয়াড়দের ভূমিকা ও প্রতীকী অবস্থান:

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি এবং স্পেনের উদীয়মান তারকা লামিন ইয়ামাল এই বিভক্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। মেসির ইসরাইলের সাথে ব্যক্তিগত ও পেশাদার সম্পর্ক রয়েছে এবং অতীতে তিনি বেশ কয়েকবার দেশটি সফর করেছেন। অন্যদিকে, ১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয়ের পর ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শন করে আলোচনায় এসেছেন। যাকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সংহতির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সানচেজ বলেন, লামিন শুধু সেই সংহতিই প্রকাশ করেছে, যা লাখো স্প্যানিশ নাগরিক অনুভব করেন।

Amardesh_Yamal_Palestine_
Amardesh_Yamal_Palestine_

রাজনৈতিক মেরুকরণ:

আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই ইসরাইলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তিনি দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে ইসরাইলপন্থী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এর বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচক।

অনলাইন বিতর্ক ও তত্ত্ব:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ম্যাচটিকে ইসরাইল বনাম প্যালেস্টাইন বিশ্বকাপ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। তবে এই আলোচনাকে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্বে রূপ নিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে কিছু সমালোচকদের মতে, ইহুদিরা ফিফা নিয়ন্ত্রণ করে এবং আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করার জন্য রেফারির সাহায্য নেওয়া হতে পারে।

কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রায়ান রোজবিয়ানি- এক্স-এ লিখেছেন, আমরা একটি ইসরাইল বনাম ফিলিস্তিন বিশ্বকাপ পেতে চলেছি ।

“অংশগ্রহণকারী সকল দলের মধ্যে আর্জেন্টিনাই একমাত্র দল যারা প্রকাশ্যে ও ধারাবাহিকভাবে ইসরাইলপন্থী,” লিখেছেন একজন এক্স ব্যবহারকারী, যার বায়োতে লেখা আছে যে তিনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরোধী। “এ কারণেই আমি তাদের সমর্থন করছি।”

সাবেক এমএমএ ফাইটার এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের সোচ্চার সমর্থক খাবিব নুরমাগোমেদভ তার ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে একই ধরনের একটি বার্তা পোস্ট করে লিখেছেন, “আমি জানি আমি কাকে সমর্থন করছি।

আমেরিকান সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার এবং লাইভ স্ট্রিমার স্নেকো সপ্তাহ দুয়েক আগে মন্তব্য করেন: ‘আর্জেন্টিনা হলো দক্ষিণ আমেরিকার ইসরাইল।’

স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম, যিনি বিশ্বকাপে দলের ম্যাচগুলোতে প্রায়ই ক্যামেরার সামনে উপস্থিত থাকেন, তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিষয়ে একজন সোচ্চার প্রবক্তা। তিনি টুর্নামেন্ট চলাকালীন একাধিক ম্যাচে ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে ধরেছেন এবং সাম্প্রতিক সেমিফাইনালের সময় আরেকজন দর্শককে বলেছেন, অস্তিত্বই প্রতিরোধ।

Amardesh_Messyl_Jerusalem_
Amardesh_Messyl_Jerusalem_

ইসরাইলভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা সাইবার ওয়েলের প্রধান তাল-অর কোহেন মন্টেমায়োর অভিযোগ করেন, বিশ্বকাপের বিশাল দর্শকসমাগমকে ব্যবহার করে ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে। তার ভাষ্য, মেসিকে লক্ষ্য করে করা অনেক পোস্টে সরাসরি ইহুদিদের নাম উল্লেখ না থাকলেও ‘ইহুদিরা ফিফা নিয়ন্ত্রণ করে’ বা ‘গোপনে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে’—এ ধরনের পুরোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।

আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত:

যদিও বর্তমান সরকার ইসরাইলপন্থী, তবে সব আর্জেন্টাইন নাগরিক এই অবস্থান সমর্থন করেন না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের পর ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে এক সমর্থক বলেন, সত্যিকারের কোনো আর্জেন্টাইন ইসরাইলকে সমর্থন করে না। আমাদের প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করবেন না। কেউ কেউ কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি একসময় ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে বলেছিলেন, আমার হৃদয় ফিলিস্তিনের।

ফুটবল মাঠের এই লড়াই এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের একটি ছায়া হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যেখানে মেসি এবং ইয়ামাল অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রে চলে এসেছেন ।

এমএমআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন